রেজাউদ্দিন স্টালিন

বাস্তব ছোঁয়া স্বপ্নের মন্তাজ

কবিতা হচ্ছে কারো কাছে শোকের, কারো কাছে তীরবেঁধা পাখির যন্ত্রণা কিংবা অনুভবের নান্দনিক উত্সার। কবিরা শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে বিষয়ে ভাবে ব্যঞ্জনায় বোধে অলঙ্কারে প্রকরণে ছন্দে শৈলী-সুষমা-চারুতায় কবিতার শরীর গঠন করেন, একে জীবন্ত প্রাণবন্ত করে তোলেন। বিশ শতকের ষাটের দশকের প্রারম্ভে উত্তাল সময়ে তাঁর জন্ম শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ জেলা যশোরে। উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে। মঞ্চ এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা এবং পরিচালনায়ও সুবিদিত তাঁর নাম। এগুলো তাঁর পেশা ও শিক্ষাভিত্তিক পরিচয়। কিন্তু তাঁর বড় পরিচয় তিনি কবি; অবশ্য ভালো গদ্যশিল্পীও। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে যে নতুন সৃজন ও নির্মাণের পর্ব শুরু হয়, তার একটি সরব ক্ষেত্র হচ্ছে কবিতা। এই পর্বের অন্যতম সাহসী ও ব্যতিক্রমধর্মী কবি হলেন রেজাউদ্দিন স্টালিন। আশির দশকেই টগবগে তরুণ বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ। যেমন : পূর্ণপ্রাণ যাবো (১৯৮৩), ফিরিনি অবাধ্য আমি (১৯৮৫), দাঁড়াও পথিকবর (১৯৮৫), ভেঙে আনো ভেতরে অন্তরে (১৯৮৯) এবং সেইসব ছদ্মবেশ (১৯৮৯)। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত হয় আরো কয়েকটি গ্রন্থ : রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা (১৯৯০), আশ্চর্য আয়নাগুলো (১৯৯০), আঙুলের জন্য দ্বৈরথ (১৯৯৩), পৃথিবীতে ভোর হতে দেখিনি কখনো (১৯৯৬), রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা সংগ্রহ (১৯৯৭), আশীর্বাদ করি আমার দুঃসময়কে, হিংস্র নৈশভোজ, লোকগুলো সব চেনা, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে, পদশব্দ শোনো আমার কণ্ঠস্বর, সবশেষ গ্রন্থ ‘স্তব্ধতার শোকবহি’ ইত্যাদি কবিতার জন্য্য তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমীসহ অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার। স্টালিন বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কবিদের অন্যতম। তাঁর কবিতায় যুগযন্ত্রণা, বৈদগ্ধ ঐতিহ্যপ্রীতি ইতিহাস-চেতনা যন্ত্রসভ্যতার কুফল মানবিকতা অমানবিকতা নৃশংসতা অসাম্য সামপ্রদায়িকতা আধিপত্যবাদ স্বদেশপ্রেম মানুষের ভণ্ডামি ইত্যাদি অনুষঙ্গ নানাভাবে বিধৃত হয়েছে নৈপুণ্যের সঙ্গে। এই কবি ভাব প্রকাশ শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে অত্যন্ত সতর্ক ও কুশলী। তিনি নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন, ‘আমি এসেছি আক্রান্তদের মধ্য থেকে’, ‘বোবাকান্নার পার্থক্য বুঝো’, ‘বিভাজনের মধ্য থেকে’, ‘নির্যাতনকাহিনী কাঁধে’, ‘বিভ্রমের ইন্দ্রজালে আটকে পড়া লড়াই থেকে’, ‘ধর্মাধর্মের নিষ্ঠুরতার গর্ভ থেকে।’ (পদশব্দ শোনো আমার কণ্ঠস্বর)। স্টালিন স্বপ্ন দেখেন ঋণমুক্ত কৃষকের ঘরে সোনামুখি ধান ওঠার, হিরন্ময় রোদে নারীদের শাড়ি শুকানোর, শিশুরা কবিদের শব্দ উপমায় পুষ্প হওয়ার এবং ‘বর্বর বাতাস যেন ছিঁড়ে না ফেলতে পারে আমাদের অর্জন’ (প্রাগুক্ত)। নানা অনুষঙ্গে স্টালিনের কবিতায় পূর্বসূরি কাহ্নপদ, চণ্ডীদাস, আলাউল, কালিদাস, সগীর, জ্ঞানদাস, লালন, হাছন, মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-নজরুল-আল মাহমুদ প্রমুখ কবির কথা এসেছে। তিনি লিখেছেন : ‘কবি কি ফোটাতে পারে জন্মফুল—রক্তলাল কিছু’ (জন্মদাগ), ‘উন্নত শির অবনত কেন হবে’..., ‘প্রয়োজনে সব নজরুল হবো আজ, বাতাসে ওড়াবো বাবরি দোলানো কেশ’ (প্রশ্ন)। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর দুটো কবিতা রয়েছে :‘কবিগুরুর প্রতি’ ও ‘২৫ বৈশাখের প্রতিকৃতি’। শেষোক্ত কবিতায় রবীন্দ্রনাথকে তিনি চিন্ময়-মৃন্ময় করে তুলেছেন নান্দনিক বাক্যাবলীতে। যেমন : ‘শ্বাপদ সময়ের শনশন পেরিয়ে/ রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি একবার পাখি একবার নদী হয়ে যাচ্ছে/ আর রবীন্দ্রনাথের চুল একবার মেঘ একবার ঝড়/ এবং শ্মশ্রু বিক্ষুব্ধ মানচিত্র।’ তাঁর ‘সাদাখাতা’ শীর্ষক কবিতার প্রতিটি শব্দ ও চরণের মধ্যে বিধৃত হয়েছে ইতিহাস ও ধর্মীয় উপাখ্যানের স্থান ও চরিত্র—মুসা, ইমাম মাহদি, যিশু, ক্লিউপেট্রা, হাজেরা, গান্ধী, জেরুজালেম, সামেরি, চেচেন, চের্নোবিল। সেইসঙ্গে ভূমিহীন কৃষক, স্বার্থপর আমলা, বিবেক বিক্রয়কারী বুদ্ধিজীবীদের উল্লে¬খও রয়েছে। তিনি আক্ষেপ করেছেন :‘ক্রুশবিদ্ধ পয়ার আর চোখবাঁধা লাইনে দাঁড়ানো/ প্রতিটি বন্দি অক্ষ.../ লিখছি কাপুরুষতার কানে স্বজাতির.../ স্বার্থপর আমলা আর নখদন্তহীন জনপ্রতিনিধি/ বিবেক বিক্রয়কারী বুদ্ধিজীবীদের নীল অট্টহাসি।’ স্টালিনের প্যালেস্টাইন বিষয়ক একটি উত্কৃষ্ট কবিতা রয়েছে। প্রথমেই তাঁর উচ্চারণ : ‘প্যালেস্টাইন তোমার ভস্মস্তূপের ভেতর থেকে উদগত শোকাশ্রু/ পৃথিবীর বৃহত্তম নদী হতে পারে/ হূদয়ের শোকার্ত শিলাখণ্ড থেকে জন্ম নিতে পারে/ হিমালয়, আল্পস...’ (তোমার ভস্মস্তূপের ভেতর থেকে)। প্যালেস্টাইন এক অগ্নিগিরি। প্রতিদিন সেখানে ঘটছে বর্বরতা-নৃশংসতা সাম্রাজ্যবাদীদের সহায়তায়। এই রক্তপাত ও সহিংসতার মাঝে জন্ম নেয়া শিশুদের হাতে স্টালিন তুলে দিতে বলেন ‘ইস্পাতের অলিভকুঞ্জ’, ‘কমলার লাবণ্য’, ও ‘সাহসের সোনালি সংক্রাম’। তিনি লিখেছেন : ‘‘তোমার গর্ভে যত শহীদের উজ্জ্বল নাম’.../ তোমার সন্তানদের নামের ভেতরে আছে ইমু পাখির সংগীত.../ সেই শিশুটির আদিগন্ত হাত রক্তাক্ত পতাকার লৌহদণ্ড/ আর এতগুলো মৃত্যু ও সাহসের নাম স্বাধীনতা হোক’... স্টালিন আশাবাদী এবং স্বাপ্নিক। ‘রাক্ষসেরা এসে পড়ার আগেই’ কবিতায় তিনি স্বপ্ন এঁকেছেন : ‘কপালে নক্ষত্র আছে গর্ভবতী নারীরা এমন সন্তানের অপেক্ষায় থাকে’ কিংবা ‘কৃষক স্বপ্ন দেখে এমন এক মাঠের যেখানে ফসলের মৌসুম কখনো ফুরোয় না’ অথবা ‘কবি স্বপ্ন দেখে এমন এক পদের যা সব নাগরিকের কণ্ঠস্থ’। ‘আপনার মনে পড়ে’ কবিতায় স্টালিন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সংগীত-পরিবারের উত্তরাধিকারের কথা লিখেছেন ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানের অনুষঙ্গে। কবিতাটির ভাঁজে ভাঁজে স্টালিন ছড়িয়েছেন সুরধ্বনি : ‘আপনার মনে পড়ে মহাভারতের রথে সরোদের সুরধ্বনি/ কলকাতা থেকে সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ায়/ সানফ্রানসিসকো থেকে ওকল্যান্ড ঘুরে/ বাহাদুর হোসেন খান/ আপনার মনে পড়ে/ নবীনগরের নারী নথ নেড়ে তিতাসের তীরে যায়/ তাদের চুড়ির শব্দে ক্ষুধিতের ঘরে আজো/ শোনা যায় ইমনকল্যাণ’। স্টালিন মানতাবাদী এবং প্রতিবাদী কবি। তাঁর প্রতিবাদ মূর্ত হয়েছে ‘একশো বছর পর’ এবং ‘গুজরাট ২০০১’ শিরোনামের কবিতায়। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, প্যালেস্টাইন নিয়ে তার আরো কয়েকটি প্রতিবাদ। তিনি লিখেছেন ‘একশো বছর পর’ কবিতায় : ‘প্রতি একশো বছর পর জাগবেন পিতা ইবরাহিম/ দেখবেন তার সন্তানের শিরোচ্ছেদ করছে বনি ইসরাইল/ জেরুজালেমের জঠরে আবার জন্ম নিয়ে যিশু দেখবেন.../ স্বর্গ থেকে মাতা মরিয়ম দেখবেন.../ আর মা হাজেরা ইসমাইলের শোকে/ বেথেলহেমের পথে পথে মাতম করছে/ পেরেক ও কাঁটার ক্ষত তার পায়ের রক্তে/ ভেসে যাচ্ছে হজরে আসওয়া’... নৃশংসতার এমন চিত্রকল্পময় বর্ণনা কবিতাটিকে দিয়েছে যেমন ঐতিহাসিক সত্যতা, তেমনই পাঠকচিত্তে বেদনাসিক্ত অনুভবও। তাঁর ‘গুজরাট ২০০১’ কবিতাটিও পড়তে চোখ পানিতে ভিজে ওঠে, হূদয় কেঁপে ওঠে। স্টালিনের এই কবিতাটি সামপ্রদায়িকতাবিরোধী কবিতার ইতিহাসে বিশ্বসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। ভারতের গুজরাটের মুসলমানহত্যার চিত্র তিনি এভাবে এঁকেছেন : ‘অসংখ্য মৃত্যুমণ্ডিত নিস্তব্ধতা প্রেতদের হাতে হাতে/ এগিয়ে দিচ্ছিল পানপাত্র/ প্লেটে প্লেটে পরিবেশিত অসংখ্য জীবন দিয়ে/ রান্না করা সুস্বাদু খাবার/ এই হিংস্র ভোজোত্সবের গন্ধে উজ্জীবিত প্রস্তরযুগ/ গুজরাটের গিরিখাদের নিস্তব্ধ পরিধির মধ্যে/ পরিস্রুত হাড়গোড় রক্ত-মাংস আর করোটি...’। ‘শোকের নির্ঘণ্ট’ নামে স্টালিনের আরো একটি উত্কৃষ্ট কবিতা রয়েছে। এই কবিতার মধ্যেও তাঁর দরদি-উচ্চারণ ও মায়ের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাওয়া যায়। স্টালিন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে এই নষ্ট-ভ্রষ্ট সমাজ ও রাজনীতির চিত্র এঁকেছেন ‘মেঘবৃষ্টির কাব্য’ কবিতায়। তাঁর দ্বিধাহীন উচ্চারণ :‘এখন প্রয়োজন নতুন জাহাজের/ সেখানে ঠাঁই পাবে কবি ও শিল্পীরা/ এবং রমণীরা যাদের জরায়ুতে/ বীরেরা জন্মাবে এবং কবুতর/ শস্যসন্ধানী কৃষক দেবদূত।/ পঙ্গু সান্ত্রী ও ব্যর্থ সাংসদ/ মূর্খ আমলা ও পতিত পণ্ডিত/ যোগ্য নয় কেউ জাহাজে উঠবার। স্টালিনের এরকম আরো অনেক কবিতা রয়েছে যেখানে তিনি মেরুদণ্ডী হয়ে উচ্চারণ করেন : ‘পণ্ডিতের দাঁত ভীষণ ধারালো/ পাংশুবর্ণ.../ সেনাপতিদের দাঁত খুব মজবুত.../ যেসব দাঁতে রক্তের দাগ/ সারাজীবন চেষ্টা করেও/ তা পরিষ্কার করতে পারিনি আমি। (টুথপেস্ট)। ‘রপ্তানি শর্ত’ কবিতায় তিনি লিখেছেন : জন্মাবধি কোন কিছুই উদ্বৃত্ত দেখিনি.../ এই বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর কোনো দেশে/ রপ্তানিযোগ্য কিছু নেই।.../ ‘অর্থান্তর’ কবিতাটিও লক্ষণীয়। তিনি লিখেছেন : ‘বণিকেরা হাইব্রিড প্রজনন ঘটিয়ে/ বদলে দিচ্ছে অর্থ আমূল...’ মননে-সৃজনে একজন ভালোবাসাবাদী কবি স্টালিন। তাঁর ভালোবাসা মন থেকে মনান্তরে, জন থেকে জনান্তরে, স্থান থেকে স্থানান্তরে ছড়িয়ে পড়বে, এটিই তার কাম্য। তাই তিনি লিখেছেন :‘আমি বেরিয়ে পড়েছি ভালোবাসার খোঁজে/ বিশ্বাস করি ভালোবাসতে বাসতে/ এই ব্রহ্মাণ্ড একদিন আমার হবে।.../ আজ পর্যন্ত যত কিছু স্পর্শ করেছি কোনো কিছুই/ ভালোবাসার চেয়ে অত্যুষ্ণ নয়...’ স্টালিনের এই উচ্চারণ, এই প্রতীতি প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষেরই মনের উচ্চারণ। বর্তমান সংক্ষুব্ধ ও সংরাগসংকুল দেশ, সমাজ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে স্টালিনের কবিতা যেমন মূর্তিমান প্রতিবাদ, ইতিহাস আশ্রয়ী, তেমনি শক্তি-শান্তি-সৌরভমণ্ডিত। স্টালিনের কাব্যপ্রতিভা বিকশিত হোক নান্দনিকতায় সত্য-সুন্দর-কল্পনার সংশ্লেষে। ইতিহাস পুরাণ ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের নবতর ব্যবহার স্টালিনকে দিয়েছে বিপুল বৈভব। আমি মনে করি—মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ ও রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা ধারাবাহিক উন্নয়ন। [প্রবন্ধে বর্ণিত কবিতাংশ ‘পদশব্দ শোনো আমার কণ্ঠস্বর’, কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া।]