আতংকের শহর সীতাকুণ্ড

চার দিনে ৫৩ গাড়িতে আগুন সহস্রাধিক যানবাহন ভাংচুর দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রপ্তানি স্থবির জামায়াত ও শিবির কর্মীদের হামলায় গোটা সীতাকুণ্ড আতংকের শহরে পরিণত হয়েছে। গত বুধবার পর্যন্ত ৪ দিনে ৫৩টি গাড়িতে আগুন এবং সহস্রাধিক যানবাহন ভাংচুর করা হয়েছে। গত বুধবার গভীর রাতেও জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে র্যাব-পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুইজন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় ১০ জন। বুধবার রাত ১১টার দিকে পুলিশ পাহারায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয় তবে কিছুক্ষণ পর আরো ২টি ট্রাকে আগুন দেয়া হলে যানবাহন চলাচল আবার বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য এসব পুড়ে যাওয়া যানবাহন সরিয়ে নেয়ার পর আবার যান চলাচল শুরু হয়। এই মহাসড়কে ক্রমাগত যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমদানি করা পণ্য যেমন দেশের বিভিন্ন স্থানে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি রপ্তানি পণ্যও বন্দরে ঢুকতে পারছে না। সীতাকুণ্ডে এই সহিংসতা দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সীতাকুণ্ডে গত কয়েক দিনের ভাংচুর ও গাড়ি পোড়ানোর মামলায় গত বুধবার পুলিশ বিভিন্ন স্থান থেকে ১৭ জনকে গ্রেফতার করে। সীতাকুণ্ড সংবাদদাতা এম গিয়াস কামাল সাগর জানান, বুধবার রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড একটি আতংকের শহরে পরিণত হয়। গভীর রাতেও জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সাথে পুলিশ ও র্যাবের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন আহত হয়। গভীর রাতে আরো ৩টি পণ্যবাহী ট্রাকে এবং বাড়বকুণ্ডে এক ইউপি মেম্বারের বাড়িতে আগুন দিয়েছে তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাব-পুলিশ, বিজিবিও যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ শাহীন ইমরান। গতকাল বৃহস্পতিবার জামায়াত নেতা মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামের লাশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে উপজেলা বাড়বকুণ্ড এলাকায় বিকাল ৩টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় জামায়াত নেতা শামশুল ইসলাম এমপিসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জানাজার পূর্বে জামায়াত নেতারা তাদের বক্তব্যে আমিনুল ইসলাম হত্যার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ি করেন। চট্টগ্রাম অফিস থেকে সালাহউদ্দিন মো. রেজা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড এলাকায় অব্যাহত সহিংসতা ও অরাজক অবস্থা চট্টগ্রামসহ সারাদেশের অর্থনীতিকে উদ্বেগজনক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন জানান, গত কয়েক মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের আমদানি রপ্তানির হূদপিন্ড চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড স্থবির হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা আমদানিকৃত পণ্য যেমন দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছাতে পারছে না। তেমনি রফতানি পণ্যও চট্টগ্রাম বন্দরে ঢুকতে পারছে না। সীতাকুন্ডের সহিংস অবস্থার কারণে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ পরিবহন মালিকগণ ভাড়া ব্যাপক বৃদ্ধি করেছেন। পরিবহন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন বাদল জানান, রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মালিকগণ সহজে ট্রাক ভাড়া দিতে চায় না। ভাড়া দিলেও ভাংচুর ও জ্বালাও পোড়াও এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে পূর্বের তুলনায় বেশি সময় লাগার অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া চাচ্ছে। কাজীর দেউড়ী এলাকার টাইলস ব্যবসায়ী ফারুক জানান, ঢাকায় ৬ হাজার টাকার ভাড়া ১০ হাজার টাকা নিচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে একটি ট্রাক পৌঁছাতে এখন তিনদিন পর্যন্ত লেগে যায়। উপর্যুপরি হরতাল এবং মহাসড়কে যানবাহন ভাংচুর ও জ্বালাও পোড়াওয়ের কারণে অনেকে বন্দর থেকে পণ্য ছাড় করতে পারছে না। শিল্পের কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিসহ প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে না পারায় আমদানি পণ্যের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। অপরদিকে যথাসময়ে কাঁচামাল না পাওয়ায় উত্পাদিত পণ্য বাজারে যাচ্ছে না। এতে করে উত্পাদনকারী এবং ভোক্তাগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রফতানি পণ্যসমূহও যথাসময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বলে অনেক গার্মেন্টস মালিক তাদের পণ্য বাধ্য হয়ে উড়োজাহাজে করে পাঠাচ্ছেন। ফলে তারা বিরাট লোকসানের শিকার হচ্ছেন বলে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়। অনেকের অর্ডার পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে। জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড অংশে অন্ততঃ ১৫টি প্রাইভেট কন্টেইনার ডিপো থেকে রফতানি পণ্য বন্দরে যেতে পারছে না। একইভাবে এ সকল ডিপো থেকে আমদানি পণ্যসমূহও দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে পারছে না। বিজিএমইএ’র প্রাক্তন সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, মালিকগণ গার্মেন্টস পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে সাহস করছেন না। কারণ, ইতিমধ্যে অনেকের গার্মেন্টস কাভার্ড ভ্যান আগুনের জন্য পুড়ে গেছে। গার্মেন্টস মালিকগণ বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছেন। আবার সীতাকুন্ড-মীরসরাই মহাসড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন শিল্প কলকারখানাও বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তারা কাঁচামাল যেমন যথাসময়ে পাচ্ছে না। আবার তৈরি পণ্যও বাজারে পাঠাতে পারছে না। সকলের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। রফতানি পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বন্দরে পৌঁছাতে না পারায় বন্দর থেকে জাহাজসমূহকে পণ্য ছাড়াই ছেড়ে যেতে হচ্ছে। ফলে জাহাজ মালিকগণও আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।