অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে তাদের কাউকে দমাতে পারেনি নিজের লক্ষ্য থেকে। তাঁরা দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রাম করে টিকে থেকেছেন সমাজে। নিজেদের প্রচেষ্টায় তাঁরা আজ প্রতিষ্ঠিত। তাদের এ অবস্থায় আসতে স্বীকার করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা। সমাজের নানা কুসংস্কার ও বাধা অতিক্রম করে তাঁরা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জানিয়ে দিয়েছেন তাদের অস্তিত্বের কথা। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস পালন উপলক্ষে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি ক্যাটাগরিতে পাঁচজন সফল নারী নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন— অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনকারী নারী ছালেহা হক চৌধুরানী, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী হাছিনা আক্তার, সফল জননী নারী মনোয়ারা বেগম, নির্যাতনের বিভীষিকা ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী ফাতেমা বেগম ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী খন্দকার ফরিদা ইয়াসমিন। তাদের জীবন সংগ্রামের গল্প জানাচ্ছেন— মো. মিজানুর রহমান
হাছিনা আক্তার
বাড়পাড়া ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের হাছিনা আক্তার জানান, দরিদ্রতাকে জয় করে তিনি আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি অনেক কষ্ট করে এইচএসসি পাস করেছেন। তিনি আরো লেখাপড়া করতে চাইলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বাধাগ্রস্ত হয়ে আর পড়ালেখা করতে পারেননি। এরপর বিউটি পার্লারের কাজ শিখেছেন। আজ নিজের ২টি বিউটি পার্লার রয়েছে। তাঁর একমাত্র মেয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে অধ্যয়নরত। সে এলাকায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ সামাজিকভাবে পালন করে আসছেন। তুলাতলি গ্রামে একটি মহিলা সমিতি রয়েছে। উক্ত সমিতিতে ৪০ জন মহিলা সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ২ জন নারী স্বামী পরিত্যক্ত, ৪ জন বিধবা কর্মী রয়েছেন। তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন।
ফাতেমা বেগম
মঙ্গলমুড়া গ্রামের আজিজ মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম নির্যাতনের বিভীষিকা ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করা এক সংগ্রামী নারী। তিনি জানান, সংগ্রাম করেছেন নিজের ও সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন স্বাস্থ্যকর্মী হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজ উদ্যোগে হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য রোগীদের ভর্তি করেছেন। তিনি গ্রামে মাদক ও যৌতুক এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে ভূমিকা পালন করে আসছেন। সদর দক্ষিণ উপজেলা মহিলাবিষয়ক অফিস থেকে ব্লক-বাটিক এবং পার্লারের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজ বাড়িতে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছেন। এতে ১০ জন মহিলা কাজ করছেন। কুমিল্লা সিটি মার্কেটে একটি দোকান করেছেন এবং সেখানে একজন কর্মচারী কাজ করছেন।
ছালেহা হক
চৌধুরানী
চৌয়ারা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামপুর গ্রামের সামছুল হক মুন্সীর স্ত্রী অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনকারী ছালেহা হক চৌধুরানী। তিনি জানান, দরিদ্রতার সঙ্গেই ছিল তাঁর বসবাস। অভাব-অনটনের সংসারে উন্নতির জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে বর্তমানে তাঁর একটি মহিলা সমিতি রয়েছে। যার সদস্য সংখ্যা ৪০ জন। সকলেই সদর দক্ষিণ উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিস থেকে ব্লক-বাটিক এবং পার্লারের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে ২০ জন মহিলা ব্লক-বাটিক কাজে তাঁর সমিতিতে নিয়োজিত রয়েছেন। উক্ত সমিতিতে ১০টি সেলাই মেশিন রয়েছে। এলাকার দরিদ্র মহিলাগণ সেলাইয়ের কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন
এবং কর্মরত রয়েছেন।
মনোয়ারা
বেগম
দক্ষিণ বাগমারা গ্রামের মৃত নুর হোসেন মিয়ার স্ত্রী সফল জননী মনোয়ারা বেগম। তিনি জানান, সামান্য লেখাপড়া জানা সত্ত্বেও তার এক ছেলেকে ডিগ্রি পাস করিয়েছেন। মেয়ে ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত রয়েছেন। তিনি একটি কিন্ডারগার্টেনে গত ২৯ বত্সর যাবত্ শিক্ষকতা করছেন। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। তিনি একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে কাপড় সেলাই করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতা লাভ করেছেন।
খন্দকার ফরিদা
ইয়াসমিন
ধনপুর গ্রামের মো. নাইমুল হকের স্ত্রী খন্দকার ফরিদা ইয়াসমিন সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন দীর্ঘদিন যাবত্। তিনি জানান, বিয়ের পর তার স্বামীর আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় কয়েকজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে তিনি একটি কোচিং সেন্টার খুলেছেন। বর্তমানে তার কোচিং সেন্টারে ৭৫ জন ছাত্রছাত্রী বিনামূল্য লেখাপড়া করছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে তিনি এইচএসসি পাস করেছেন। তখন তার অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। বর্তমানে তিনি সচ্ছল। তার স্বামী ব্যবসায়ী। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তিনি নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে
কাজ করে যাচ্ছেন।