উপজেলা পর্যায়ে বিচার বিভাগের সম্প্রসারণ প্রয়োজন
মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৪
পৃথিবীর বয়স যতদিন মানুষে মানুষে বিরোধের বয়সও ততদিন। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই বিরোধ নিষ্পত্তির বিভিন্ন পন্থা মানুষ আবিষ্কার করেছে। আদালতের বাইরে বা আদালতের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিরও প্রক্রিয়া রয়েছে।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা প্রধানত ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সে কারণে প্রচলিত বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে অনেক পিছিয়ে রেখেছে। আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে সততা, নিরপেক্ষতা, ন্যায্যতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও মানবিক দিক প্রাধান্য থাকার কথা। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম, অবিচার, হয়রানি, স্বজনপ্রীতি, নিয়মবহির্ভূত ও অনৈতিক বিষয়গুলো দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার সমসাময়িকীকরণ প্রয়োজন। আইনের প্রয়োগ ও বিচারকার্যে মানুষের সর্বোচ্চ স্বার্থ সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
অন্যায়, অপরাধ, অবিচার, জুলুম, খুন-খারাবি, জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে মানুষের শেষ ভরসা আদালত। সেই আদালতে যদি বিচারক স্বল্পতা বা শূন্যতা দেখা দেয় তাহলে জনগণের বিচারপ্রাপ্তি বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত হবে এটা স্বাভাবিক। সারা দেশেই কমবেশি বিচারক স্বল্পতা রয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর বিচার বিভাগীয় ২০২ ও নির্বাহী বিভাগের ১৬ জনসহ মোট ২১৮ জন ম্যাজিস্ট্রেটের পদ সৃষ্টি করা হয়। এরপর প্রথম দফায় ৩৯০ এবং দ্বিতীয় দফায় ২১১ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে চাহিদা অনুযায়ী বিচারকের সংখ্যা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের ভয়াবহ মামলা জটের অন্যতম প্রধান কারণ বিচারকের অপর্যাপ্ততা।
কোনো অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আত্মা ও পরিবার শান্তি খুঁজে পায় এবং অন্য অপরাধীরা অপরাধ করতে সাহস করে না। বিজ্ঞান প্রযুক্তির সমন্বয়ে অপরাধী শনাক্তকরণ ও বিচার প্রক্রিয়া সহজ করে বর্তমান প্রচলিত বিলম্বিত বিচারব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন অপরাধ প্রবণতা দমনের অন্যতম উপায়। উপজেলায় বিচারিক আদালত না থাকায় পুলিশি ব্যবস্থাও অতিমাত্রায় স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে গড়ে উঠেছে রাজনীতির অপরাধপ্রবণতার একটা সখ্য। সার্বিক ভারসাম্যের জন্য উপজেলা পর্যায়ে বিচার বিভাগের সমপ্রসারণ প্রয়োজন।
দেশের গ্রামীণ গরিবদের বিচারের সুবিধাদানের নামে আইন মন্ত্রণালয় ও আদালতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ‘গ্রাম আদালত আইন ২০০৬’-এর অধীনে ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক একটি ‘গ্রাম আদালত’ বিদ্যমান। এ আইনের অধীনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধির বেশ কিছু ধারাবলে মামলা রুজু করার বিধান রয়েছে। মামলার আবেদন করা, মামলা নথিবদ্ধ করা, বাদি-বিবাদিকে সমন দেওয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ, ‘হলফনামা আইন ১৮৭৬’ অনুযায়ী হলফ পাঠ করানো, লিখিতভাবে মামলার রায় প্রদান ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট বিধান এ আইনে রয়েছে। ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানাও আরোপ করতে পারে। গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী এ আদালতের বিচারক হিসেবে যাঁরা নিয়োজিত তাঁরা হলেন ইউপি চেয়ারম্যান, দুজন ইউপি সদস্য এবং অপর দুজন সাধারণ মনোনীত ব্যক্তি। তাঁদের কারো বিচারকার্য পরিচালনার উপযোগী শিক্ষাগত পটভূমি, আইন বিষয়ে দক্ষতা, প্রয়োজনীয় আইনবিষয়ক শিক্ষা প্রশিক্ষণ নেই। এ আদালতের ওপর দেশের উচ্চতর কোনো আদালতের নজরদারি পর্যন্ত নেই। প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে এ আদালতের বিচারকদের রায় লেখার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ নেই। এ আদালতের প্রদত্ত রায় কার্যকর করার মতো ইউনিয়ন পরিষদের যথাযোগ্য প্রশাসনিক শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
এসব কারণে ২৮ নভেম্বর ২০১২ তারিখে ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— বিশ্বের ৯৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের দেওয়ানি বিচারব্যবস্থা সবচেয়ে খারাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়— মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগা ও বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতিই দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকার জন্য দায়ী।
চলমান স্বাধীন বিচার বিভাগের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। একটি দেশের বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে রাষ্ট্রের সার্বিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতাও নিশ্চিত করা যায় না। দেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগের ঘটনা ঘটছে। বিচারপতি নিয়োগব্যবস্থায় সংস্কার আনা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক পরিশুদ্ধি আনা সম্ভব নয়। মেধা ও দক্ষতা এ দুটি বিষয় যাতে বিচারপতি নিয়োগ নিশ্চিত হয় সেটি দেখা বিশেষভাবে প্রয়োজন। মেধা বিচারে শিক্ষাসনদ বাংলাদেশের প্রধান মাপকাঠি হলেও ডিগ্রি সবসময় মেধা বিচারে একমাত্র বিবেচ্য হয় না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কর্মকমিশনের পরীক্ষা যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়।
দেশে আইন শিক্ষা বিস্তারে এবং বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের ফলে যে বিপুল সংখ্যক মানসম্পন্ন আইনজীবী প্রয়োজন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় তা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে অধ্যয়নের সুযোগ বিদ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক থাকলে তো বই নেই, ক্লাসরুম থাকলেও হোস্টেল নেই। বিদেশি কোনো শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্রছাত্রী ভর্তি নীতিমালা গ্রহণ করা হয়নি। বিচারাঙ্গনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং বিচারব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে প্রয়োজন দেশে আইনশিক্ষার প্রসার। আর এক্ষেত্রে স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
চট্টগ্রাম