তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের এক বছর

বিচার শেষ হয়নি এখনো

সাভারের নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের আজ এক বছর। গত বছরের ২৪ নভেম্বর ওই কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা যায় ১১২ জন শ্রমিক। অবশ্য বিভিন্ন গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে মৃতের সংখ্যা আরো বেশি। এই এক বছর স্বজনহারাদের পরিবার কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। স্বজনকে নিজ হাতে কবর দেয়া বা সত্কার করার ভাগ্যটুকুও জোটেনি অনেকের। কারণ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া স্বজনকে তখন আর চেনার উপায় ছিল না। ওই কারখানায় উন্নত কর্মপরিবেশ সৃষ্টির শর্ত পূরণ না করে কাজ চালানোর জন্য কারখানাটির মালিক দেলোয়ার হোসেনকে দায়ী করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু এখনো দায়ী কারও শাস্তি দেখেনি নিহতদের স্বজনরা। এখনো কোন ক্ষতিপূরণও দিতে হয়নি তাকে। ক্ষতিপূরণও পায়নি সব নিহতের পরিবার। তাজরীনের মত কর্মপরিবেশহীন কারখানার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। দ্রুত শ্রম আইন করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) ট্রেড ইউনিয়ন চালুসহ পাঁচ দফার একটি সুপারিশ করেছে মার্কিন সিনেট। তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পার হওয়ার মুহূর্তে সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক-বিষয়ক কমিটি এক প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করেছে। গতকাল শনিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আহত শ্রমিকদের মধ্যে এখনো কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। সুমাইয়া নামের একজন শ্রমিকের অবস্থা সংকটাপন্ন। বর্তমানে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। দুর্ঘটনার পর তার ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি এখন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। এছাড়া আহতদের মধ্যে শাহনাজের ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া মুক্তা বানু, আলিমুরসহ আরো অন্তত ২০ জন এখনো আহত অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারখানাটির মালিক দেলোয়ার হোসেন এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছেন। নিয়ম অনুযায়ী কেবল শ্রমিকদের পাওনা বকেয়া মজুরি দিয়েছিলেন। তাকে একদিনের জন্যও জেলে যেতে হয়নি। এরই মধ্যে তার আরো ৬টি কারখানা চালু রয়েছে। ওসব কারখানায় যথারীতি সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ চলছে। ওসব কারখানার বেতন-ভাতাও ঠিকমত পরিশোধ করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ঈদের আগে বকেয়া মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা তাকে কারখানায় অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে অবশ্য বিজিএমইএ’র হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় তা সমাধান হয়। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, নিহত শ্রমিকদের জন্য মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করেছি। বিজিএমইএ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, শুরুতে ৬২ জনের লাশ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আরো ৩৭ জনের লাশ সনাক্ত হয়েছিল। সনাক্ত হওয়া এই ৯৯ জনের পরিবার সর্বমোট ৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল। আহত ৯০ জন ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পায়। এছাড়া ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সিএন্ডএ আহতদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে মোট মজুরির সমপরিমাণ টাকা দিচ্ছে। নিহতদের ৮২ জন এতিম সন্তানকে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান লিএন্ডফাং প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা করে দিচ্ছে। নিহত ৪০ জনের পরিবারকে বিজিএমইএ’র সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রতি মাসের মজুরির সমপরিমাণ টাকা দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে বাকি ১৩ জনের লাশ এখনো সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই ১৩ জনের পরিবার কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান কর্মীদের সমন্বয়ে এ বিষয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজ করা হচ্ছে। সরকারের ১১২ জনের তালিকার বাইরে তারা আরো ২৬ জন নিহত হয়েছে বলে একটি তালিকা তৈরি করেছে। এ নিয়ে তারা আদালতে একটি রিট দায়ের করেছিল। ইতিমধ্যে ওই তালিকা থেকে ১০ জনকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই নৃবিজ্ঞান অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপের সদস্য ও গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের নেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ। তার দাবি, ওই ঘটনায় আহত ৪০ জন এখনো সুস্থ হতে পারেনি। ওই কারখানায় মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টসহ অনেক ক্রেতার কাজ হতো। দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য চাপ তৈরি হলেও মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তা আমলে নেয়নি। এশিয়া ও ইউরোপের একাধিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ দিতে এগিয়ে এলেও মার্কিন কোম্পানিগুলো বরাবরই উদাসীন। গতকাল এ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।