মাওবাদীদের পি ঠ টা ন!
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩১
হিমালয় কন্যা নেপাল। এখন সেখানে বরফ শীতল মৌসুম হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তেমনটি নয়। বরং এর পুরো উল্টো। পার্লামেন্ট নির্বাচনের আংশিক ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনীতির মাঠ। সাবেক মাওবাদীরা আবার যেন স্বরূপে ফিরতে শুরু করেছে। গত ১৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের ভোট যতটুকু গণনা হয়েছে, তাতে শোচনীয়ভাবে হেরে যাবার লক্ষণ দেখেই পিছুটান দিয়েছে তারা। অর্থাত্ পরাজয়ের মধ্যে তারা নেই। আগে বন্দুকের জোরে অসংখ্য লড়াই জিতে আসা মাওবাদীরা নির্বাচনে পরাজয়ের আভাস পেয়েই ভোট গণনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। মাওবাদী দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহাল, যিনি প্রচন্ড নামেই অধিক পরিচিত তিনিই স্বয়ং ধমক দিয়েছেন ভোট না গোনার জন্য। তাঁর অভিযোগ, ভোটে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম হয়েছে। প্রচন্ড অবশ্য ভোট চলাকালে এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটুকু করেননি। যখনই পরাজয় আঁচ করতে পারলেন, তখনই তাতে কারচুপি ধরা পড়লো। তাই নির্বাচন কমিশন প্রচন্ডের ভোট গণনা বন্ধের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ভোট গণনা বন্ধ না হলে মাওবাদী দল গণপরিষদ বয়কট করবে।
নেপালে চলছিলো প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরোনো রাজতন্ত্র। ২০০৮ সালে সেই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একটি সাম্যবাদী সমাজতান্ত্রিক দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ভয়ঙ্কর মাওবাদী গেরিলারা তাদের অস্ত্র ফেলে রাজনীতিতে নামেন। একসময় যাদের নাম শুনলেই মানুষ ভয়ে থরথরিয়ে কাঁপতো, নির্বাচনের সময় তাদেরকেই দেখা গেছে জনগণের দ্বারে গিয়ে ভোট চাইতে। কিন্তু সমস্যা হলো, গত পাঁচ বছরে নেপালে পাঁচটি সরকার ক্ষমতায় এলো আর গেলো। অথচ গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র সংবিধান রচনা করতে পারেনি দেশটি। ২০০৮-এর নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেও সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থ হন প্রচণ্ড। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে স্পর্শ করতে পারেননি প্রচণ্ড। রাজতন্ত্র উত্খাত করার বিষয়ে গোটা জাতি ছিলো দ্বিধা-বিভক্ত। শক্তি দেখিয়ে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যকে হটিয়ে দেয়াটাই ছিলো আসল ভুল। এ কারণেই ক্ষমতায় একবছরও টিকতে পারেননি প্রচন্ড।
সাধারণ নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯ নভেম্বর। পার্লামেন্টের ৬০১ আসনে নির্বাচনে দাঁড়ান শতাধিক দলের ষোল হাজারেরও বেশি প্রার্থী। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রায় এক কোটি বিশ লাখ ভোটারের ৭০ শতাংশই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারসহ পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, ভোটের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হলেও ভোটে কোন অনিয়ম হয়নি। আংশিক ফলাফল অনুযায়ী নির্বাচনে এগিয়ে আছে মধ্যপন্থিখ্যাত নেপালি কংগ্রেস পার্টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট)। নির্বাচনে প্রচন্ডের মাওবাদী দলের অবস্থান তৃতীয়। এমন শোচনীয় পরাজয় জেনে নির্বাচন বয়কট করার হুমকি দেন প্রচন্ড। রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি আসনেও হেরেছেন তিনি। ফলে আবারো রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে নেপালে। তবে এরই মধ্যে নেপালি কংগ্রেস পার্টির নেতারা বিজয় মিছিল ও শোভাযাত্রা করেছে রাজধানীতে। প্রচন্ডকে তার আসনে হারিয়ে দিয়েছেন এমন গুজব শুনে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে আনন্দে মাতেন রাজন কেসি। যদিও পরে জানা গেছে মাত্র কয়েক ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন প্রচন্ড। তবে ভোটাররা বলছেন, তারা ভোট দিয়েছেন মূলত প্রচন্ডের বিরুদ্ধে। কারণ তিনি আগের কোন প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করতে পারেননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাওবাদীরা ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশব্যাপী বিরাট পরিবর্তনের জোয়ার তুলে নাটকীয়ভাবে বিজয় পেয়েছিলো। কিন্তু এর পর থেকে তাদের জনসমর্থন কতটা কমতে শুরু করেছে তা তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এবার নির্বাচনে জনসমর্থনের তৃতীয় কাতারে চলে যাওয়াটা তাদের কাছে একটা বিরাট চমক। যা মাওবাদীরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
আগামী বছরই প্রচণ্ড পা রাখবেন ষাট বছর বয়সে। তিনি ছিলেন কৃষিবিজ্ঞানের ছাত্র এবং একজন শিক্ষক। দশ বছর ধরে প্রচন্ড চালিয়ে গেছেন সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ। আর এতে মারা গেছে তেরো হাজারেরও বেশি মানুষ। প্রচন্ড বলতেন, তিনি এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা চান, যেখানে শ্রেণী, বর্ণ বা লিঙ্গের কোন বৈষম্য থাকবে না। থাকবে না অর্থনৈতিক ভেদাভেদ। কিন্তু তিনি ও দলের অন্য বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতার বিরুদ্ধেই প্রাসাদ সদৃশ বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়িসহ অন্যান্য ভোগে গা ভাসিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটাও মাওবাদীদের প্রতি জনসমর্থন কমে যাবার অন্যতম একটি কারণ। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হবার পর জাতিকে সংবিধান উপহার দেবার কথা থাকলেও তিনি তা দিতে পারেননি। উল্টো সাবেক গেরিলাদের পদবী নিয়ে সেনাবাহিনীর সাথে বিবাদে জড়ান তারা। তবে এই মুহূর্তে নেপালে বিরাজ করছে একটা বিরাট শূন্যতা। যেখানে এখন স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় সরকারের অস্তিত্ব নেই। নেই কোন সংবিধান বা পার্লামেন্ট। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার লীল কণ্ঠ ইউপ্রেতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি খিলরাজ রেজমির শক্ত পদক্ষেপের উপর নির্ভর করছে নেপালের শান্তি আর স্থিতিশীলতা।