বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানি সংকট

ভোর রাত্রিতে সেহরি খাইতে উঠিয়া পানি পান না রাজধানীর আদাবর, জুরাইন মাদ্রাসা রোড, পূর্ব দোলাইরপাড়, দনিয়াবাজার এলাকার মানুষ। শুধু তাহাই নহে, সেহরি খাইয়া অন্য সকল এলাকার মানুষ যখন ঘুমাইতে যান ঠিক তখন এসকল এলাকার মানুষ বাহির হন মগ-বালতি নিয়া ওয়াসার ট্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াইয়া পানি সংগ্রহ করিতে। ইহা দিয়াই চলে সারাদিনের খাওয়া, গোসল, অজুসহ সকল দৈনন্দিন কাজ। তবে এই এলাকাগুলির পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির অভাবে রান্না, গোসল, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। আবার অনেক এলাকায় বাসিন্দারা ওয়াসার পানি পায় ঠিকই, তাহা ব্যবহার অনুপযোগী। লাইনে হলুদ রঙের পানি আসে। পানিতে দুর্গন্ধ। এমনকি ফুটাইয়াও পান করা যায় না, গোসল, ধোয়ামোছার কাজও না। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে একদিকে প্রচণ্ড গরমে নাগরিক জীবনে হাঁসফাঁস, অন্যদিকে রোজা। তাহার ওপরে নাই পানি। ফলে চরম ভোগান্তিতে আছেন রাজধানীবাসী। অন্যদিকে, পানির সংকট কাজে লাগাইয়া ওয়াসার কতিপয় অসাধু কর্মচারী রমরমা ব্যবসা করিতেছে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। পরিণতিতে, অতিষ্ঠ হইয়া বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগী নাগরিকরা পদযাত্রা করিয়াছে।

রাজধানীতে পানির চাহিদা মিটাইতে ৮৬ ভাগ পানি ভূগর্ভ হইতে তোলা হইতেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বত্সরে ১০ ফুট করিয়া নামিয়া যাইতেছে। বর্তমানে সাগরের পানির স্তরের তুলনায় ঢাকার পানির স্তর ১৭০ ফুট নামিয়াছে। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে আগামী ৫০ বত্সরে ঢাকার ভূগর্ভ লবণপানিতে ভরিয়া উঠিবে। কেবল ঢাকার কথাই নহে, বিএডিসির তথ্যমতে, দেশের ৪১ জেলার ১৯২ উপজেলায় দেখা দিয়াছে তীব্র পানিসংকট। ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ’ অনুযায়ী, চলতি শুষ্ক মৌসুমে পাঁচ লক্ষ অগভীর নলকূপ অকেজো হইয়া পড়িয়াছে। এখন অনেক এলাকায় মাটির ২৪ ফুট নিচেও পানি পাওয়া যাইতেছে না। ওয়াটার এইড জানাইতেছে, সুপেয়পানি পাইতেছে না দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। অধিকাংশ এলাকায়ই শুরু হইয়াছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। পানির মধ্যেই বসবাস করিয়া ‘পানি দুর্ভিক্ষের’ শিকার উপকূলবাসী। উপকূলীয় অঞ্চলে এখনই ১০ কিলোমিটার দূর হইতে খাবার পানি সংগ্রহ করিতে হইতেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। পাশাপাশি চিংড়ি চাষ ও লবণশিল্পের প্রসারের কারণে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিতেছে উপকূলীয় এলাকার গভীরে। এপ্রিল-মে মাসে সাগর হইতে প্রায় ২০০ কিলোমিটার ভিতরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের লোহাগড়ায় মধুমতী নদীতে লবণ পানি পাওয়া গিয়াছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাটিতে বর্তমানে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে ৯ পিপিটি। অথচ মাটির সহনীয়মাত্রা ০.৪৪ হইতে ১.৮ পিপিটি। ইহার প্রভাবে গাছপালার পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমিয়া যাইতেছে। পুকুরে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পাইয়া মাছসহ বহু জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হইতে যাইতেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকা জলবায়ু বিষয়ক এক প্রতিবেদনে লিখিয়াছে, ‘বাংলাদেশ: রক্তে যাহার জন্ম, লবণাক্ত পানিতে তাহার মৃত্যু’। এমন লিখিবার কারণ, ব্যবহারোপযোগী পানি দ্রুত ফুরাইয়া আসিতেছে দেশটিতে। এই অবস্থার উত্তরণের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাইয়া আনিতে হইবে। বৃষ্টির পানি ধরিয়া রাখিতে হইবে। বাড়াইতে হইবে সেচ দক্ষতা। একই সঙ্গে পানির উত্স তৈরি এবং নদীনালা খনন ও বড় বড় জলাধার তৈরি করিতে হইবে। উপরন্তু নিরাপদ পানি, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ লইতে হইবে। একই সঙ্গে এলাকা-উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বৃহত্ গবেষণা উদ্যোগও লইতে হইবে।