যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি (টিকফা) সই করেছে বাংলাদেশ। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া ৯টায় ওয়াশিংটনে এ চুক্তিটি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ চুক্তিতে সই করেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন দেশটির বাণিজ্য দপ্তরের উপ-প্রধান ওয়েন্ডী কাটলার। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত একরামুল কাদের, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) মাইকেল ফোরম্যান, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশওয়াল এবং দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মাইকেল ফোরম্যান বলেন, টিকফার ফলে শ্রমিক ইস্যু, বাণিজ্য বিষয়ক সমস্যা এবং জিএসপিসহ (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা) বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা করার আনুষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া এর মাধ্যমে উভয় দেশের সহায়তায় বাংলাদেশে কিভাবে শ্রমিক অধিকার রক্ষা করা যায় সে সুযোগও সৃষ্টি হবে। একরামুল কাদের বলেন, টিকফা হলো বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে এ চুক্তি বেশ কাজে আসবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি পুনরুদ্ধার এবং ডিউটি ফ্রি ও কোটা ফ্রি পণ্য প্রবেশে বাংলাদেশ আলোচনা করতে পারবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছে টিকফা চুক্তি। চুক্তির ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি খোলামেলা ও ভালো পরিবেশ তৈরি হবে। সমপ্রসারিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে লাভবান হবে উভয়পক্ষ এবং তারা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতা এবং রক্ষণশীল উপাদানগুলো কমিয়ে আনবে। টিকফা চুক্তিতে উভয়পক্ষের সেবা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা দূর করা; বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় মেধাস্বত্ব আইন বাস্তবায়ন; আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মূল নীতি মেনে উভয় দেশের শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন এবং পরিবেশের সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করতে পরিবেশ আইন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের সদস্য হিসাবে উভয়পক্ষই জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদের প্রতি আনুগত্য দেখাবে। বিশেষ করে সনদের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সম্পর্কিত ধারাগুলো অনুসরণ করতে হবে। দেশীয়/বৈদেশিক উভয় ক্ষেত্রেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এতে আরও বলা হয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়নে একটি ফোরাম গঠন করা হবে, যে ফোরাম বছরে কমপক্ষে একবার বৈঠক করবে। বাংলাদেশের পক্ষে এতে প্রতিনিধিত্ব করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে করবে ইউএসটিআর। উভয়পক্ষের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা চিহ্নিত করবে ফোরাম। এছাড়া উভয়পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয় চিহ্নিত করবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা অপসারণেও পদক্ষেপ নেবে। ক্ষেত্রবিশেষে বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের পরামর্শ চাইবে এ ফোরাম। চুক্তিতে মূলত চারটি বিষয় এসেছে-সংরক্ষণশীল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতি পরিহার করার প্রয়োজনীয়তা, মেধাস্বত্ব অধিকার সংরক্ষণের গুরুত্ব, দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশনের গুরুত্ব এবং শ্রম অধিকারের বিষয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০০২ সালে এ চুক্তির খসড়া প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হলেও আলোচনা শুরু হয় আরো আগে। তবে দুর্নীতি, মেধাস্বত্ব ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। শুরুতে এ চুক্তির নাম ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন মহলের সমালোচনায় এর সঙ্গে কোঅপারেশন শব্দটি যুক্ত করা হয় এবং ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ শব্দটি বদলে দেয়া হয় ফোরাম শব্দটি দিয়ে।