‘সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয় কেউ হয় না ....’ বিখ্যাত এই গানটিই মনে করিয়ে দেয়, সুখ জিনিসটি সত্যিই এক সোনার হরিণ। সবার জীবনে যেমন সুখ আসে না, তেমনি সুখ সবার জীবনে চিরস্থায়ীও হয় না। কারো জীবনে সুখ আসে, আবার হঠাত্ করে তা চলেও যায়। মানুষ চেষ্টা করেও অনেক সময় সুখকে ধরতে পারে না। আবার কারো জীবনে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে বসে থাকে। এই কথাটি সর্বজন স্বীকৃত এবং পরীক্ষিত। তাইতো গানের সুরে বলা হয়, ‘সুখ তুমি কি বড় জানতে ইচ্ছে করে...’। প্রতিটি পরিবারে যেমন সুখী এবং অসুখী দুই ধরনেরই লোক থাকে, তেমনই প্রতিটি দেশেও সুখী এবং অসুখী দুই ধরনেরই লোক থাকে। যারা নিজেকে সবসময় অসুখী মনে করেন তাদের অনেকেই মানসিক ডাক্তার ও মনস্তত্ত্ববিদের কাছে যান সাহায্যের জন্য। জার্মানির ডাসেলডর্ফের মনস্তত্ত্ববিদ আন্ড্রেয়াস সোলইয়ান বলেন, ‘তাদের কাছে এমন সব মানুষ আসেন, যারা কোনো কিছু হারানোর যন্ত্রণা ভোগ করছেন।’
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সুখের প্রাচুর্যও অনেককে অসুখী করে তোলে। অল্প সময়ের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ অনেক কিছু ঘটে গেলে মানসিক দিক দিয়ে অনেকে তাল সামলাতে পারে না। ভালো একটি কাজ পাওয়া, নতুন জীবনসঙ্গী পাওয়া, বিবাহ হওয়া, সুলভ মূল্যে একটি বাড়ি কেনার সুযোগ হওয়া— এসব স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘটে গেলে বিহ্বল হয়ে যেতে পারে মানুষ; জেগে উঠতে পারে একটা মনমরা ভাব। জার্মানির এক মনোরোগ চিকিত্সক রোলান্ড উরবান মনে করেন, দুঃখের অনুভূতির ব্যাপারে একটা মিল দেখা যায় সব ক্ষেত্রে। আর সেটা হলো, এর কারণটার ওপর মানুষের হাত নেই। মানুষ এটিকে প্রভাবিত করতে পারে না। যেমন অসুস্থতা, আপনজনের মৃত্যু কিংবা অন্য কোনো ক্ষতি হওয়া। তবে মানুষের ভেতরের একটা নিরাময় ক্ষমতা দুঃখবোধকে কমিয়ে দিতে পারে। রোলান্ড উরবান বলেন, ‘ভুক্তভোগী যদি এমন কিছু খুঁজে পান যা তার জীবনে একটা পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে দুঃখবোধটাও অনেক কমে যায়।’
কয়েক বছর আগে ব্রিটেনের ‘নিউ ইকোনমিক ফাউন্ডেশন’ নামের গবেষণা কেন্দ্র বিশ্ব সুখী সূচক বের করেছিল। ২০০৭ সালে এই কেন্দ্র থেকে প্রথমবার রেটিং পেশ করা হয়েছিল। তখন বিশ্বের এক দরিদ্রতম দেশ ভানুয়াতু (যা অস্ট্রেলিয়া থেকে পূর্বদিকে আছে), তারা সবচেয়ে সুখী বলে প্রমাণিত হয়েছিল। ব্রিটেনের লোকদের তৈরি সূচকে লাতিন আমেরিকা কয়েক বছর ধরেই নেতৃস্থানীয় হয়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে তারা প্রথম দশের মধ্যে নয়টি জায়গাই পেয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে ছিল ভিয়েতনাম। এই কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা সব দেখে-শুনে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, জাতির সত্যিকারের আত্ম অনুভূতির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতির সূচক অথবা উত্পাদনের উন্নয়ন ততটা প্রতিফলন করতে পারে না। দেখা গেছে, মানুষ সম্পদের কথা ততভাবে না— ভাবে স্বাস্থ্য ও আনন্দ নিয়ে। হার্ভার্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আনন্দ একটা ভীষণ ছোঁয়াচে ব্যাপার। তাদের মতে, যদি মানুষের চারপাশে বেশিরভাগ লোকই হয় হাসি-খুশি ও দয়ালু, তবে তাদের বিশ্ব অনুভব সেই ব্যক্তির ওপরেও পড়ে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি হলো, আনন্দ কী করে সংক্রমিত হতে পারে বিজ্ঞানীরা তার ফর্মুলাও বের করে ফেলেছেন। এই তথাকথিত রোগ একদিন অনুভব করতে পারলে মানুষ এই ভাইরাসের কবলে বারবার পড়তে চাইবে। সুতরাং এখন থেকে সবাই খুশির সঙ্গে সুখী হওয়ার রোগে ভুগতে থাকুন। মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য ‘সুখ’ নামক জিনিসটা খুবই প্রয়োজন। যারা নিজেকে অসুখী মনে করেন, তারা সুখের ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার চেষ্টা করুন—নিজেকে সুখী ভাবুন। দেখবেন সুখ আপনার জীবনে একদিন ঠিকই আসবে।
n লেখক :বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক