চিত্ত যেথা ভয়শূন্য
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০১৪, ২১:৪২
বোমা, বুলেট, রাইফেল, সাঁজোয়া যান, বোমারু বিমানের সাথে বসবাস কদিন আগেও যাদের নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল, তাদের ভয় দেখানো চাট্টিখানি কথা নয়। চিত্ত যেখানে ভয়শূন্য, সেখানে ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন শির সেখানে উঁচু থাকবেই। আর আফগান ক্রিকেটাররা তো টেস্ট দলের বিপক্ষে জয় দিয়ে গোটা জাতির জন্য এনে দিয়েছেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর উপলক্ষ।
ক্রিকেটারদের দাপটে আফগান রূপকথায় এবার যুক্ত হল —টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে মাত্র চতুর্থ ম্যাচ খেলতে নেমেই জয়! নতুন এই আখ্যানের শিকার হওয়া বাংলাদেশ যখন শোকসাগরে ভাসছে, তখন পুরো আফগানিস্তান জুড়ে চলছে ‘বিশ্বজয়ের’ উত্সব করার প্রস্তুতি।
সেই আশির দশক থেকেই রাজনৈতিক নানা উত্থান-পতনের ঝড় দেখতে হয়েছে দেশটিকে। আপাত দৃষ্টিতে এখন কিছু স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলেও সংকট যে পুরোপুরো কাটেনি সেটা পত্র-পত্রিকা ঘাটলেই স্পষ্ট হয়। দেশটির পূর্বাঞ্চলে গতকালও বোমা হামলায় মারা গেছেন ১৩ জন। সেই দেশটির ১১ জন আফগান ঘটিয়েছেন আরেক বিপ্লব।
আর সেই বিপ্লবের আগুনে পুড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট; বাংলাদেশকে রীতিমতো অপমানের সাগরে ডুবিয়ে শনিবার আফগানরা পেয়েছে ৩২ রানের এক জয়। প্রথম একটি টেস্ট দলের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে জিতে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশটির মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন আফগান ক্রিকেটাররা। গোটা আফগানিস্তান বীর সেনানীদের বরণ করে নেয়ার অপেক্ষায় আছে।
ম্যাচ জয়ের রাতেই রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাইয়ের কাছ থেকে এসেছে অভিনন্দন। দলীয় উত্সবে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। আজকেই আবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলবে তারা। তাই গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলনে আসলেন পেসার আমির হামজা হোতাক। সেখানেও বেশিরভাগ সময় কথা বললেন বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় নিয়েই, ‘এটা সত্যি অসাধারণ একটা অনুভূতি। ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। একটা টেস্ট দলের বিপক্ষে এমন একটা জয় পেয়ে সত্যিই খুব আনন্দ লাগছে।’
এক জীবনে অনেক মৃত্যু দেখে আসা আফগানরা গত বছর জয় করেছে সাফ ফুটবলের শিরোপা। ফিফার ফেয়ার প্লে ট্রফিও জিতেছে। তবে, ক্রিকেটের মহাদেশীয় মঞ্চে তারা কতটুকু কি করতে পারবে সেটা নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে একটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু গত দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন আফগান ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়ের অন্যতম নায়ক আসগর স্ট্যানিকজাই বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য ঐতিহাসিক এক জয়। আমাদের দেশের জন্য প্রতিটি জয়ই গুরুত্বপূর্ণ। এই জয়ে আমাদের দেশে ক্রিকেট আরো এগিয়ে যাবে। আমার মনে হয় না, এর আগে নতুন কোনো দল টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে মাত্র চতুর্থ ম্যাচ খেলতে নেমেই জয় পেয়েছে। ফলে উত্সব আমরা করতেই পারি।’
উচ্ছ্বাসে ভাসছেন আফগান ক্রিকেটের প্রতীক হয়ে ওঠা দলনেতা মোহাম্মদ নবী, ‘দেশে সবাই অনেক খুশি। মাননীয় রাষ্ট্রপতি টেলিফোন করে সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ছেলেরা অনেক ভাল খেলেছে। আমরা অনেক খুশি।’
আজ আফগান দলের প্রতিপক্ষ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত অপরাজিত দল শ্রীলঙ্কা। এক মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে থাকার অভিজ্ঞতা যে বেশ ভালভাবেই কাজে লাগাচ্ছে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের দল, সেটা বলে না দিলেও চলে। কিন্তু, আফগান দলটির মধ্যে ভয়-ডরের লেশ মাত্র নেই। হামজা হোতাক বলেন, ‘আমরা গর্বিত যে আমরা একটা টেস্ট দলকে হারাতে পেরেছি। আগামী ম্যাচগুলোতেও আমাদের ভাল খেলতে হবে। আমাদের নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা আছে। মাঠে সেটাই প্রয়োগ করতে চাই।’