জনবলের অভাবে জেলা-উপজেলা হাসপাতালে যন্ত্রপাতি অব্যবহূত

ঢাকার বাইরে জেলা উপজেলা হাসপাতালে কেন্দ্রীয় মেডিক্যাল স্টোর থেকে সরবরাহকৃত কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। বেশিরভাগ যন্ত্রপাতির এমন অবস্থা, যা মেরামত করারও সুযোগ নেই। ঢাকার বাইরে অনেক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরীক্ষ-নিরীক্ষার এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর বিকল হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও সিভিল সার্জন অফিস ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেছেন, ওই সকল যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব রয়েছে দীর্ঘদিন। অপরদিকে সরবরাহকৃত ওই সকল যন্ত্রপাতির বেশিরভাগ নিম্নমানের, কোন মেশিনের যন্ত্রাংশ সঙ্গে নেই। নানা কারণে এসব যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়ে আছে। আবার মাত্র একটি পার্টসের জন্য কোটি টাকা মূল্যের মেশিনও বহু বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে মেরামত করার কোন ক্ষমতা নেই। এই কাজের জন্য অনুমোদন পেতে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এসব অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে ওই সব মেশিন বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে আছে। জেলা উপজেলায় প্রায় ৭০ হাজার জনবলের পদ বহুবছর ধরে শূন্য। আবার এমন সব যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়েছে যা হাসপাতালের কোন প্রয়োজন নেই। যা প্রয়োজন তা সরবরাহের জন্য বলা হলেও তা সরবরাহ করা হয় না বলে কর্মকর্তারা জানান। এসব জেলা উপজেলার হাসপাতালে সময়মত রোগীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে না পেরে রাজধানীর হাসপাতালে প্রতিদিনই এসে ভিড় জমাচ্ছে। সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এসে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে রোগীরা। অনেকের রাজধানীতে থাকার জায়গা না থাকায় পার্কে, রেলস্টেশনে ও বাসস্টেশনে রাত কাটাতে হয়। এমন চিত্র প্রতিদিন রাজধানীর হাসপাতালে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা জেলা উপজেলায় না করতে পেরে রোগীদের সাধারণ অপারেশনের জন্যও ঢাকার হাসপাতালে আসতে হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলেন, একটি মেশিন নষ্ট হলে বা মেরামতের প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হয়। অনুমতি পাওয়ার পর ওই যন্ত্র সচল করার জন্য মহাখালীর কারখানায় পাঠাতে হয়। কিন্তু অনুমতি পেতে নিম্নে এক থেকে দুই বছর সময় লাগে। অনেকে চেষ্টা তদবির করে অনুমতিপত্র পেয়ে মহাখালীর কারখানায় মেশিন পাঠালে সেই মেশিন সাত দিন চলার পর পুনরায় বিকল হয়ে যায় যা আর কখনো মেরামত করা সম্ভব হয় না। ওই কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ, কোন মেশিন সেখানে পাঠালে ওই মেশিন সচল না হয়ে উল্টো বিকল হয়ে আসে। এ কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ওই কারখানায় কোন মেশিন মেরামতের জন্য পাঠাতে চায় না। এ কারণেও মেশিন বাক্সবন্দী করে রাখা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গত ৫ বছরে সরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য সহস্রাধিক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে। যা প্রয়োজন নেই। নিম্ন মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। এক জনের উপর এসব কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ওই সব কর্মকর্তারা নিরাপদে থাকছেন। একটি ফাইল অধিদপ্তর কিংবা মন্ত্রণালয়ের সেকশন থেকে শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে অনুমোদনের জন্য যাওয়ার আগে ৫ থেকে ৬ কর্মকর্তা অনুমোদনের জন্য স্বাক্ষর করেন। এরপর সর্বশেষ ব্যক্তি অনুমোদন দেন। এই ছয় কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে কিছুই করা সম্ভব হয় না। অথচ ওই এক কর্মকর্তার উপরই সব অভিযোগ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নয়া মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নুরুল হক বলেন, জেলা উপজেলা হাসপাতালে কিংবা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে কী কারণে যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অবস্থায় বহুবছর পড়ে আছে তা সনাক্তকরণে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে ওইসব অব্যবহূত যন্ত্রপাতি দ্রুত চালু করা হবে বলে তিনি জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, জেলা উপজেলা হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয় নিয়ে কোন দুর্নীতি হয়েছে কি না, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে কি না, নিম্ন মানসহ অন্যান্য অব্যবস্থাপনা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জনস্বার্থে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যাতে বিকল যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত করতে পারেন, সেই কাজের অর্থ ব্যয় করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে। এই কাজ মন্ত্রণালয় অধিদপ্তর থেকে মনিটর করবেন বলে তিনি জানান। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, সাদুল্যাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবলের অভাবে ২০১০ সাল থেকে অপারেশন থিয়েটারে তিনটি এসি ব্যবহার না করায় বিকল হয়ে আছে। সাকার মেশিন স্টোরে পড়ে আছে। রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। বরিশাল অফিস জানায়, শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৯৮০ সালে বাক্সবন্দী অবস্থায় একটি মেশিন সরবরাহ করা হয়। তা আদৌ বাক্স থেকে খোলা হয়নি। এর মধ্যে কী মেশিন আছে তা-ও কেউ বলতে পারে না। সমপ্রতি কেন্দ্রীয় মেডিক্যাল স্টোর থেকে জীবাণুমুক্তকরণের তিনটি অটো ক্লেভ মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। খোলার পর এগুলো বিকল অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই অবস্থায় তা বাক্সবন্দী করে রাখা হয়েছে। ২০০৮ সালে তিনটি মেশিন অপারেশন থিয়েটারের জন্য পাঠানো হয়। তা-ও বিকল অবস্থায় পড়ে আছে।