বিশ্ববিদ্যালয় তদারকিতে ক্ষমতা চায় ইউজিসি
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৪, ২৩:১৪
দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ধরনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া আছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি)। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন না করলে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না ইউজিসি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা দেখে যাওয়া আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ পাঠানো। আর যে মন্ত্রণালয়ের কাছে এই সুপারিশ পাঠানো হয় সেটিও কিনা খুব কমই আমলে নেয় ইউজিসির সুপারিশ। এক কথায় ইউজিসি যেন একটা ঠুঁটো জগন্নাথ। এমনাবস্থায় দেশে সত্যিকার অর্থে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভালে নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা অপরিহার্য বলে মনে করছে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউজিসির যে ক্ষমতা তাতে তারা যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম সম্পর্কে জবাবদিহিতা করতে পারে। ইউজিসির নির্দেশনা মতো না চললে পরবর্তী সময়ে অর্থ বরাদ্দও বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এ ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখছে না। সব কাজ-কর্মেই যেন গা ছাড়া ভাব।
সামপ্রতিক কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির ভূমিকা নেই বললেই চলে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়ালেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের মতো। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ছাত্র আন্দোলন প্রশমনে কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি ইউজিসি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসির বেসরকারি শাখায় বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেছে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা বলেন, ইউজিসির কারো কারোর সুপারিশে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়েছে, শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি মওকুফ করতে হয়েছে। এর বিনিময়ে নিয়ম না মানা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবৈধ সহযোগিতাও দিয়েছে ইউজিসি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করছে। শিক্ষা বহির্ভূত খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, নীতিমালা না মেনে জনবল নিয়োগ, বিদ্যুত্ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়-ব্যয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি না করেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ অবৈধ শাখা বানিয়ে শিক্ষা ব্যবসা শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা দ্বন্দ্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে তৈরি হচ্ছে দুটি বা ততোধিক অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়। একই ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে একের অধিক উপাচার্য। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না ইউজিসি।
এসব অভিযোগের জবাবে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, আইনি দুর্বলতার কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। ইউজিসি কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, ইউজিসির মূল আইনে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখভালের সুযোগ দেয়া হয়নি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজ নিজ আইনে ইউজিসির বিষয়টি উল্লেখ থাকায় এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘কাগজে কলমে’ দেখভালের সুযোগ পেয়েছে ইউজিসি। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ থাকার কারণে এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখভালের সুযোগ রয়েছে। নিয়ম না মানা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কখনো কখনো সুপারিশও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় ওই সব সুপারিশ আমলে নিচ্ছে না। ইউজিসি কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার নামে বাণিজ্য, নৈরাজ্য, ট্রাস্টি বোর্ড বা মালিকদের দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যদিও এসব বিষয়ে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত করে প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
মন্ত্রণালয়ও উপেক্ষা করছে ইউজিসিকে : প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উচ্চ শিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রনের জন্য ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশনের খসড়া বিধিমালা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে আছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে এটি এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে। কিন্তু কোন ফল নেই। ইউজিসির ভাষায় ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ এ বিষয়গুলো নিয়ে মন্ত্রণালয় যেন উদাসীন। এছাড়া ইউজিসি প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পরিসংখ্যান ভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, ১৯৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ সংস্কার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় ব্যয়, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংস্কার, সেশনজট নিরশনসহ নানাবিধ সুপারিশ দেয়। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইউজিসি প্রতি বছর প্রায় একই ধরনের সুপারিশ দেয়। কারণ হিসাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের কোন উদ্যোগ দেখা নেই। এ কারণে একই ধরনের সুপারিশ করা হচ্ছে। ইউজিসির সুপারিশ যেন উপেক্ষিত।
জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, বলতে গেলে ইউজিসির কোন ক্ষমতাই নেই। এটি একটি অ্যাডভাইজরি বডি হিসাবে কাজ করে। যা মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ দেয়। এই সুপারিশের আলোকে কখনো মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, কখনো করে না। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে যে প্রেক্ষাপটে ইউজিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা এখন পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। এই সব প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে দেখভালের জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতা দরকার। এ কারণে ইউজিসিকে ‘উচ্চ শিক্ষা কমিশন’ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। বিশ্বের অনেক দেশে উচ্চ শিক্ষা কমিশন আছে। যে দেশে নেই সেখানে উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সচিব মোহাম্মদ খালেদ বলেন, ইউজিসির মূল আইনে কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আইন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার আলোকেই কাজ করতে হচ্ছে। কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ১০ নম্বর আদেশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব, কর্তব্য ও কর্মপরিধি পূর্বের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কমিশনের যে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও আইনী কাঠামো রয়েছে তা বর্তমান বিশ্বের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ইউজিসিকে অন্যান্য দেশের আদলে উচ্চশিক্ষা কমিশন হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে অধিকতর শক্তিশালী, স্বাধীন, অর্থবহ ও কার্যকর করা দরকার।