আজো বঞ্চনার শিকার গার্মেন্টসের নারী শ্রমিক
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৪, ২৩:১৮
সড়কের পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলেছেন হাজার হাজার নারী। কেউবা চড়ে বসেছেন লক্কড়-ঝক্কর বাসে ঠাসাঠাসি করে। কমবয়সী এই নারী স্রোতের কোন একটি দল হয়তো খুব কাছেই কোন বহুতল ভবনে ঢুকে পড়ছেন। আবার কোন কোন দল হেঁটে চলেছেন মাইলের পর মাইল। রাজধানীর কাক ডাকা ভোরেই শুরু হয়ে যায় এই নারীদের যাত্রা। অনায়াসে যে কেউ বলে দিতে পারে-এরা গার্মেন্টস শ্রমিক। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা এসব শ্রমিক কাজ করছে রাজধানীর বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায়। শুধু আশুলিয়া, মিরপুর কিংবা সাভার নয়, রাজধানী ঢাকার প্রায় সব এলাকায় সকাল-সন্ধ্যা এই দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে।
পায়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল, হাতে ছোট্ট টিফিন ক্যারিয়ার কিংবা প্লাস্টিকের বাটি। তাতে রয়েছে ভর্তা, সাদা ভাত। পরনে আধ ময়লা জামা। প্রায় সবার চেহারাই হার জিরজিরে। দেখে সহজেই বোঝা যায়; অপুষ্টি পিছু ছাড়েনি ওদের। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কারখানায় একটানা কাজ করে ওরা।
তাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। কোনমতে খেয়ে পরে সংসার চালানোর মত সামান্য রোজগার। কিন্তু সেটাই ‘সোনার হরিণ’ হয়ে সারাক্ষণ দূরে সরে যায়। চলে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এদের একজন রুবিনা আক্তার (১৯) চার বছর থেকে কাজ করছেন গার্মেন্টসে। হেলপার হিসাবে কাজে যোগ দিলেও এখন তিনি অপারেটর। বেতনও বেড়েছে কিছুটা। রুবিনা আক্তার বলেন, ‘আগেও ডাল বা আলু ভর্তা দিয়ে দুই বেলা ভাত খাইতাম; এখনও তাই খাই। বেতন বাড়ছে, কিন্তু আলু ভর্তার জায়গায় মাছ জোটে নাই।’ রুবিনা বলেন, ‘বাড়িতে বুড়া বাবা-মায়ের জন্যে ট্যাকা পাঠাইতে হয়। অনেক কষ্ট করে এখানে থাকি। তারপরেও থাকি। কারণ গ্রামে কোন কাজ নাই।’
শারমিনা বেগম (১৮)। দেখতে বয়সের তুলনায় কিছুটা ছোট। শারমিনা বলেন, ‘কাজ পাইছি পাঁচমাস হইছে।’ এর আগে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করলেও গর্ভবতী হওয়ায় তার চাকরি চলে যায়। গ্রামে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সন্তানটিও মারা যায়। শারমিনা বলেন, ‘এবার কাজ শুরু করছি, কিন্তু কাজের চাপে প্রায় অসুস্থ থাকি। এ কথা কারখানায় কইতেও পারি না। অসুস্থতার কথা কইলে ছুটি তো দিবই না, উল্টো ছাটাইও করতে পারে।’ উপায় না পেয়ে শারমিনা অসুস্থ শরীরে কাজ করে যাচ্ছেন।
পীরগঞ্জের শাহীনূর বেগম। ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা শেখাবেন বলে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে চলেছেন গার্মেন্টস কারখানায়। মিরপুর ১৩ নম্বরে একটি ঘরে চারজন মিলে থাকেন। শাহীনূর বেগম বলেন, ‘এ যাবত্ সাতটি কারখানা বদলাইছি। কাম ভালো করি; কিন্তু দুই বছরের বেশি হইলেই বিনা অপরাধে ছাঁটাই হই।’ শাহীনূর বেগম বলেন, ‘বাচ্চা হবার সময় চাকরি থাকে না। তখন দ্যাশে গিয়া থাকি। আবার শরীল সুস্থ হইলে আসি। কাম ছাড়া গরিবের কি আছে! জমিজিরাত নাই; গার্মেন্টসে কাম করি কোনরকমে দিন কাটে। নেতারা কয়, ‘শ্রমিকদের এমন দিন থাকবো না; নেতাদের সাথে মিছিলে যাই মিটিংয়ে যাই; কিন্তু হেই দিন তো আহে না...!’
শাহীনূর বেগম আর রুবিনা আক্তারের কথা এদেশের লাখো নারী শ্রমিকের। অনেক না পাওয়া আর বঞ্চনার মাঝেও শ্রমিকরা কারখানাকে যেমন সচল রেখেছেন; তেমনি অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করে টিকিয়ে রেখেছেন। যাদের শ্রমের বিনিময়ে মজবুত হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সেই শ্রমিকরাই থাকছে যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত আর অবহেলিত। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমলেও এ দেশের শ্রমজীবীরা ছিল সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও নির্যাতিত। শ্রমিকরা তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে রখেছে গৌরবময় ভূমিকা।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই গার্মেন্টস শিল্পে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করে। তার মধ্যে ৮০ ভাগই নারী। এই শ্রমিকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। অথচ তারা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। নিত্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, বাসা ভাড়াসহ সবকিছুই আগের তুলনায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ রফতানি আয়ের শীর্ষে থাকা শতকরা ৭৬ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পখাতে নিরলস পরিশ্রমী শ্রমিকের মজুরি সবচেয়ে কম। শ্রমিকদের অসন্তুষ্ট রেখে শিল্পের উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। তারা বলছেন, শিল্পের উন্নয়ন গতিশীল রাখতে মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে মালিকের প্রতি শ্রমিকের আস্থা অর্জন করতে হবে। শ্রমিককে বোঝাতে হবে, তাকে অন্যায়ভাবে শোষণ করা হচ্ছে না এবং মালিক তার কল্যাণের কথা ভাবে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিককে সংগঠিত হওয়ার সুযোগও দিতে হবে।
শ্রমিকদের আন্দোলন আর সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত শ্রম আইন এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এখনো তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পখাতে শ্রমিকদের আট ঘণ্টারও বেশি সময় শ্রম দিতে হয়। আর সেবা খাত-হাসপাতাল-ক্লিনিক, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ অপ্রচলিত খাতের শ্রমিকরা সরকারি ছুটিও পান না। সরকার কয়েকটি খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দিলেও তা জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় দারিদ্র্যসীমার নিচে।
শ্রম আইনে এ সব বঞ্চনার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকলেও কোন শ্রমিকই তা পায় না। তাছাড়া মালিকপক্ষের কারসাজিতে এই সব অল্পশিক্ষিত শ্রমিকরা পেরেও ওঠে না। দরিদ্র এসব শ্রমিক চাকরি হারানোর ভয়ে সব অন্যায় আর অত্যাচার মেনে নিয়ে কাজ করেন কেবল দুই বেলা পেটভরে খাবারের আশায়।
কারখানায় কাজ করতে এসে দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলেও তারা শ্রম আইন অনুযায়ী ঠিকমত ক্ষতিপূরণ পায় না। রানাপ্লাজা ধসে ও তাজরিন গার্মেন্টসে আগুনে পুড়ে যত শ্রমিক মারা গেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২০ লাখ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা পড়ে। পঙ্গুত্ব বরণ ও কর্মহীন হয়ে পড়েন ১২ লাখ শ্রমিক। পেশাগত রোগে আক্রান্ত হন ১৬ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব লেবার ষ্টাডিজ-বিল্স তথ্যমতে দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও সহিংসতার শিকার হয়ে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
বাংলাদেশ শ্রমিক জোটের সভানেত্রী শিরীন আখতার বলেন, শিল্পের উন্নয়ন চাইলে শ্রমিক এবং মালিক উভয়ের সন্তুষ্টির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির চাকা ঘোরায় শ্রমিক। সেই শ্রমিকের আস্থা অর্জনে মালিকের বিশ্বাসের জায়গা অর্জন করতে হবে। এটা করতে পারলে যে কোন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে মোকাবিলা করা সম্ভব। ফলে একদিকে যেমন শিল্পের উন্নয়ন করতে হবে। তেমনি শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব লেবার ষ্টাডিজ-বিলেসর মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, শিল্পের উত্পাদন বাড়াতে চাইলে শ্রমিককে ভালো রাখতে হবে। এজন্য শ্রমিককে যদি বেশি বেতন নাও দিতে পারে তবে তার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ইত্যাদি ইনসেনটিভ বাড়ানো যেতে পারে। এসব দিতে সরকার মালিকপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, দেখা যায় ইপিজেড’র শ্রমিক অসন্তুষ্ট সবচেয়ে বেশি, কারণ সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন নেই। সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ এই গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়ন আমরা চাই। কারণ গার্মেন্টস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এ শিল্প থেকে কেবল মুনাফা অর্জিত হয় তা নয়; এই শিল্পে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই শিল্পের মাধ্যমে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে মালিক-শ্রমিকের ভালো সম্পর্ক থাকতে হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সংগঠিত হতে দিতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ দেয়া দরকার; শ্রমিককে বোঝাতে হবে তাকে অন্যায়ভাবে ঠকানো হচ্ছে না এবং তার কল্যাণের জন্য মালিকপক্ষ আন্তরিক।
শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি সরকারিভাবে ছয়মাস হলেও গার্মেন্টস সেক্টরে এই ছুটি চার মাস। একই দেশে দুই ধরনের ব্যবস্থা চালু, এটা বড় ধরনের বৈষম্য। কিন্তু সেই ছুটিও সব শ্রমিক পায় না। শ্রমিক নেতা দীপক রায় বলেন, অনেক গার্মেন্টসে বাধ্যতামূলক ওভারটাইম করানো হয়। এখন পর্যন্ত অনেক কারখানায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া হয়। যা শ্রম আইনের পরিপন্থী। এসব নিয়ে শ্রমিকরা কথা বলতে গেলেই ছাঁটাই করা হয়।