নালন্দা কাহিনি

চারদিকে গমগম করছে লোক। এরই মাঝে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ছোঁয়া এক অট্টালিকা। আরও কত দালান যে আছে এর চারপাশে! সে সব দালানেও কত যে মানুষ! তবে মজার ব্যাপার কী, মানুষগুলো সবাই এক রকম নয় দেখতে। সে কথা মানছি। কারণ মানুষে মানুষে চেহারার যদি কোনো তফাতই না থাকবে তাহলে তো আর মানুষ চিনে উদ্ধার করা যাবে না। আসলে কথা সেটা নয়, কথা হলো, একেবারে আলাদা আলাদা ধরনের চেহারার মানুষের ছড়াছড়ি চারদিকে। বোঝাই যায়, এরা একই পরিবারের তো নয়ই, একই দেশেরও নয়। তার মানে কী দাঁড়ালো? মানে হলো, নানান দেশের মানুষ এসে মিলেছে সেখানে। কেউ কালো, কেউ ধলো, কেউ শ্যামলা, কেউ হলদেটে। কারো নাক খাঁদা, কারো খাড়া, আবার কারোটা মাঝারি। কারো চুল সোজা, কারোটা কোঁকড়ানো, কারোটা ঢেউ খেলানো। কেউ বেঁটে, কেউ লম্বা, কেউবা মাঝারি গড়নের। এমন নানান ধরন আর চেহারার মানুষই আছে ওখানে। এমন যে বহু দেশ আর জাতির মানুষ এসে মিলেছে যে জায়গায়, সেটার নাম জানতে ইচ্ছে করছে কি? বলছি। জায়গাটার নাম নালন্দা। তবে যে সময়ের কথা বলছি তা কিন্তু বহুকাল আগের কথা। কতকাল? তা, দেড় হাজার বছর তো হবেই। কথাটা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে ভেব না যে, অতকাল আগে কি আর অ্যারোপ্লেন, মোটর আর রেলগাড়ি ছিল নাকি যে দূর দেশের লোকেরা এক জায়গায় এসে ভিড় জমানোর সুযোগ পাবে? তা অবশ্য ঠিক, কিন্তু গরজ বলে কথা। নিজের মনের টানেই লোকেরা পায়ে হেঁটে, ঘোড়া-গাধার পিটে চড়ে পর্বত-মরুপ্রান্তর পাড়ি দিয়ে জড়ো হতো জায়গাটায়। কারণ ওখানে ছিল প্রাচীন দুনিয়ার মস্ত এক বিশ্ববিদ্যালয়। সেকালের পৃথিবীর অনেক নামকরা জ্ঞানী মানুষেরা ছিলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের খ্যাতি। দেশ-দেশান্তরের ছাত্ররা উচ্চ শিক্ষার আশায় ভিড় জমাতো সেখানে। তবে অনেকেই মনে করেন, দু’হাজার বছরেরও অনেক আগে থেকেই জায়গাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ওখান থেকে বেশ কাছেই ছিল পাওয়াপুরী নামের একটা জায়গা। সেখানে জৈন ধর্মের মহান তীর্থঙ্কর মহাবীর নির্বান লাভ করেছিলেন। সেটা ছিল আনুমানিক ৪৯০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের ঘটনা। অর্থাত্ ঠিক আড়াই হাজার বছর আগেকার ব্যাপার। ধারণা করা হয় যে, তাঁকে দাহও করা হয়েছিল এখানেই। ওই জায়গাটা ছিল প্রাচীন নগরী রাজগীরের মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। তো নালন্দায় অমন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়টা কবে স্থাপিত হয়েছিল তা জানতে ইচ্ছে হচ্ছে নিশ্চয়ই। তবে প্রশ্নটার জবাবে একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে দিনতারিখের সন্ধান দেয়া কঠিন বৈকী? কতকালের পুরনো ব্যাপার, বুঝতেই পারছ। তবে মোটামুটিভাবে যা জানা গেছে তা হলো, গুপ্ত রাজবংশের বিখ্যাত সম্রাট কুমারগুপ্ত এটি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর সময়কাল ছিল ৪১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়টি ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দের আগেই যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাতে ভুল নেই। তবে প্রতিষ্ঠার পরবর্তী দু’শো বছরে এটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দুনিয়ার বিরাট এলাকা জুড়ে। যতটা জানা যায় চীন, মঙ্গোলিয়া, মায়ানমার এমনকি বহু দূরের দ্বীপদেশ ইন্দোনেশিয়ার নানান জায়গা থেকেও এখানে আসতো ছাত্ররা। তাছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের নানান প্রান্ত থেকে তো আসতোই অগনন ছাত্র। এককালে মগধের রাজধানী ছিল রাজগীর। এখান থেকে মাত্র দশ কিলোমিটারের পথ ছিল নালন্দা। বুঝতেই পারছ, রাজধানী থেকে নালন্দা মোটেই দূরের পথ ছিল না। নালন্দার এই মস্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে উপমহাদেশের খুব নামকরা একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তক্ষশীলায়। জায়গাটা বর্তমানে পাকিস্তানে পড়েছে। তো, সেই তক্ষশীলার বিশ্ববিদ্যালয়টির পরে গড়ে উঠলেও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বেশি দিন ধরে খ্যাতির সঙ্গে টিকে ছিল। গুপ্ত আমলে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তী অনেক রাজাই নালন্দার বিশ্ববিদ্যালয়কে সহযোগিতা করে টিকিয়ে রেখেছিলেন। এঁদের মধ্যে হর্ষবর্ধন এবং পালবংশের রাজাদের কথা খুবই উল্লেখ করার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়টি বিখ্যাত সব বৌদ্ধ পন্ডিতদের পদচারণায় ধন্য হয়েছিল। তাই বলে ভেব না যে, এখানে শুধুই বৌদ্ধ ধর্মের নানান বিষয় পড়ানো হতো। বরং এখানে শিক্ষা দেয়া হতো জ্ঞানের প্রায় সব জানা শাখায়। আসলে চিকিত্সাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, ধাতুবিদ্যা, শিল্পবিদ্যা, দর্শনশাস্ত্র— কী না পড়ানো হতো এখানে! আর জায়গাটা বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের অন্তর্গত হলেও বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পন্ডিতরা এখানকার শিক্ষক ছিলেন। শীলভদ্র, পদ্মসম্ভব, চন্দ্রগোমী, কমলশীল, শান্তরক্ষিত-কে না ছিলেন নালন্দায়? প্রাচীন বাংলায় এঁরা সবাই ছিলেন একেক জন জ্ঞানবৃক্ষ। নালন্দার বিদেশি ছাত্রদের মধ্যে খুব নামকরা দু’জনের কথা না বললেই নয়। দু’জনেই চীনা। একজন ইত্ সিং, অন্যজন ইউয়ান চোয়াং বা হিউয়েন সাং। দ্বিতীয়জন অর্থাত্ হিউয়েন সাং এর আমলে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্রসংখ্যা ছিল দশ হাজার, আর শিক্ষক ছিলেন দু’হাজার। তবে এত যে খ্যাতিসম্পন্ন এ বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানে লেখাপড়ার জন্যে ছাত্রদের একটি কানাকড়িও খরচ হতো না। তার মানে লেখাপড়া ছিল পুরোপুরি অবৈতনিক অর্থাত্ বিনা বেতনে। অবশ্য তাই বলে ভেব না যে, যে কেউ গেলেই তাকে ভর্তি করে নেয়া হতো সেখানে। আসলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা ছিল খুবই কঠিন বিষয়। কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে কঠোরভাবে মেধা যাচাই করে তবে ভর্তি করা হতো ছাত্রদেরকে। ফলে শুধুমাত্র মেধাবীরাই সুযোগ পেত ভর্তি হওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিশাল বিশাল গ্রন্থাগার ছিল তিনটি। এগুলো অবস্থিত ছিল মস্তবড় তিনটি অট্টালিকায়। এগুলোর নামও পাওয়া গেছে: রত্নদধি, রত্নসাগর ও রত্নরঞ্জক। মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করা হয়েছে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ। ছাত্রদের বসবাসের কক্ষ, পাঠকক্ষ, স্তূপ প্রভৃতি আবিষ্কৃত হয়েছে সেখান থেকে। আজ সেই জনকোলাহল নেই, দিনমান ঘুরে বেড়ালেও দেখা মিলবে না ইত্ সিং, হিউয়েন সাং, শীলভদ্র বা পদ্মসম্ভবের। কিন্তু তাদের স্মৃতিধন্য নালন্দার প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ আছে আজও। সেখানকার ধূলো-মাটি-ইট-পাথরে স্মৃতি রয়ে গেছে তাদের। সেই স্মৃতিই আজ ও আগামীর মানুষের অহংকার।