আফ্রিদি টর্নেডোতে উড়ে গেল রানের পাহাড়
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০১৪, ২৩:০৯
কোটি কোটি মানুষ গলা ফাটিয়ে চিত্কার করলেন দেশজুড়ে, স্টেডিয়াম মেতে রইল প্রার্থনা ও সমর্থনের শব্দে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা, বিশেষ করে ব্যাটসম্যানরাও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করলেন; রেকর্ডের পর রেকর্ড হল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ট্রাজেডি নিয়েই মাঠ ছাড়তে হল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। দলীয় সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েও টাইগাররা উড়ে গেল আফ্রিদি টর্নেডোতে।
উজ্জীবিত বাংলাদেশ, নতুন করে জেগে ওঠা বাংলাদেশের প্রবল প্রতাপের ম্যাচ আরও একবার ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা। খুব ছোট করে বললে, আরও একবার সেই শহীদ খান আফ্রিদির প্রবল প্রতাপে বাংলাদেশ ৩ উইকেটের ব্যবধানে হেরে গেল টানটান উত্তেজনার ম্যাচে। বাংলাদেশের ছুঁড়ে দেয়া ৩২৭ রানের লক্ষ্য পাকিস্তান নিজের রেকর্ড ভেঙেই টপকে গেল ১ বল আর ৩ উইকেট হাতে রেখে। পাকিস্তান কখনোই ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩২৬ রান তাড়া করে জয় পায়নি। গতকালও পাবে বলে মনে হচ্ছিল না। এই পাহাড় সমান লক্ষ্যে ছুটতে গিয়ে দুই ওপেনার শেহজাদ ও হাফিজ বিনা উইকেটে ৯৭ রান তুলে ফেলেন। কিন্তু রানরেটের অনেক পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন তারা। সেঞ্চুরিয়ান শেহজাদ শেষ দিকে এসে রানের গতিটা বাড়িয়ে ফেললেও রান ও বলের হিসেবে পাকিস্তান কিছুতেই পারছিল না। বিশেষ করে সাকিব আল হাসান একাই চেপে রেখেছিলেন রানের গতি।
৪০তম ওভার শেষে পাকিস্তানের জয়ের জন্য আরও দরকার ছিল ১০৩ রান; ওভারপ্রতি ১১.৪৪ করে! কিন্তু এই রানকেও মামুলি বানিয়ে ফেললেন আফ্রিদি। একটা পর্যায়ে বিশ্বরেকর্ডই করে ফেলবেন বলে মনে হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত রানআউট হয়ে যখন ফিরলেন, তখন আফ্রিদির রান ২৫ বলে ৫৯। তখনও সমীকরণটা একেবারে সহজ নয়; ১৮ বলে চাই ৩১ রান। এই অবস্থায় রাজ্জাকের এক ওভার থেকে ১৮ রান বেরিয়ে গিয়েই আসলে শেষ হয়ে গেল খেলা। আর শেষ ওভারে আল আমিনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ৩ রানের জায়গায় ৫ রান তুলে নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলো পাকিস্তান।
এর আগে টসে জিতে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশকে স্পর্শের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কাজটা শুরুটা করেছিলেন এনামুল হক বিজয় ও ইমরুল কায়েস। যে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের বলার মতো পারফরম্যান্সই ইতিহাস ঘুটে বের করা কঠিন, তাদের বিপক্ষেই উড়ন্ত এক সূচনা কাল এনে দিলেন এই দুই জন। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র অষ্টমবারের মতো উদ্বোধনী জুটিতে শতরান পার করে ফেললেন তারা; বলাই বাহুল্য পাকিস্তানের বিপক্ষে এই প্রথম হল কাজটা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে অষ্টমবারের মতো জুটিতে ১৫০ রান স্পর্শ করে তবে বিচ্ছিন্ন হলেন এই দুই জন। ততোক্ষণে প্রথম উইকেট জুটিতে যে কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান উঠে গেছে।
পাকিস্তানের বিপক্ষেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি গড়ে ফেললেন এনামুল ও ইমরুল। টেস্টে প্রত্যাবর্তন ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছিলেন। গতকাল ৭৫ বলে ৫টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজানো ৫৯ রানের এক ইনিংস খেলে স্মরণীয় করে রাখলেন আড়াই বছর পর ওয়ানডে খেলতে নামাটাকে। ইমরুল সেঞ্চুরি পর্যন্ত না পৌছানো নিয়ে হতাশ হলেও হতে পারেন, তবে সে হতাশা বাকী রাখেননি বিজয়।
তবে ইমরুল ফেরার পর দায়িত্বটা নেন আসলে মুমিনুল হক। বিজয় যখন সেঞ্চুরির জন্য ভাবছেন, তখন এসে রানের চাকাকে দিব্যি সচল রেখে আরেকটা ফিফটি করে ফিরলেন মুমিনুল। আউট হওয়ার আগে ৪৭ বলে ৬টি চারে সাজানো ৫১ রানের ইনিংস খেলে গেলেন। আর বিজয় নার্ভাস নাইনটিসে এসে একটু ধীরগতির হয়ে গেলেও দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটা তুলে নিতে একটুও ভুল করলেন না। ১৩২ বলে ৬টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজানো ঠিক ১০০ রানের ইনিংস খেলে আউট হলেণ এনামুল হক।
ফিফটি করে মুমিনুল আর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করে বিজয় আউট হওয়ার পর শুরু হল মুশফিক-সাকিবের তান্ডব। ভালো ভিতকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয়, তার ‘টিউটোরিয়াল ক্লাশ’ করালেন যেন বর্তমান ও সাবেক অধিনায়ক। চতুর্থ উইকেটে মাত্র ৫.৪ ওভার স্থায়ী জুটিতে এই দু জন রান তুললেন ৭৭! মানে প্রতি ওভারে গড়ে ১৩.৫৮ করে রান তুললেন মুশফিক ও সাকিব।
দু জনের মধ্যে সাকিব যা করলেন, তাতে ৩৩ বলে ৫১ রান করা মুশফিককেও ম্লান মনে হল। কারণ অন্য প্রান্তে মাত্র ১৬ বলে ৪৪ রানের দানবীয় এক ‘ক্যামিও’ খেলে অপরাজিত রইলেন ‘কামব্যাক হিরো’ সাকিব আল হাসান।
সাকিব-মুশফিক দাপটে শেষ ১০ ওভারে ১২১ এবং শেষ ৫ ওভারে ৬৮ রান তুললো বাংলাদেশ। আর সব বাদ দিয়ে শুধু ব্যাটিংয়ের জন্যই তো এই ম্যাচকে বাঁধিয়ে রাখা সম্ভব!
স্কোরকার্ড
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
এনামুল ক শেহজাদ ব আজমল ১০০ ১৩২ ৬ ৪
ইমরুল ক আকমল ব তালহা ৫৯ ৭৫ ৫ ২
মুমিনুল ক হাফিজ ব আজমল ৫১ ৪৭ ৬ ০
মুশফিকুর নটআউট ৫১ ৩৩ ৮ ০
সাকিব নটআউট ৪৪ ১৬ ৬ ২
অতিরিক্ত (লেবা ৩, ও ১৫, নো ৩) ২১
মোট: ৫০ ওভারে ৩২৬/৩
বোলিং: হাফিজ ১০-০-২৭-০, গুল ১০-১-৭৬-০, রেহমান ০-০-৮-০, ফাওয়াদ ২-০-১২-০, তালহা ৭-০-৬৮-১, আজমল ১০-০-৬১-২, আফ্রিদি ১০-০-৬৪-০, মাকসুদ ১-০-৭-০।
পাকিস্তান
শেহজাদ ব রাজ্জাক ১০৩ ১২৩ ১২ ১
হাফিজ ক ইমরুল ব মুমিনুল ৫২ ৫৫ ৮ ০
মিসবাহ ব সাকিব ৪ ৪ ১ ০
মাকসুদ ক বিজয় ব মুমিনুল ২ ৫ ০ ০
ফাওয়াদ রানআউট ৭৪ ৭০ ৪ ২
রেহমান ক জিয়া ব মাহমুদউল্লাহ ৮ ৮ ০ ০
আফ্রিদি রানআউট ৫৯ ২৫ ২ ৭
আকমল নটআউট ১৪ ৯ ২ ০
গুল নটআউট ০ ০ ০ ০
অতিরিক্ত (বা ১, লেবা ৩, ও ৯)
মোট: ৪৯.৫ ওভারে ৩২৯/৯
বোলিং: সফিউল ৫-০-৪৯-০, আল আমিন ৬.৫-০-৫০-০, সাকিব, রাজ্জাক ৯-০-৭২-১, মুমিনুল ৯-১-৩৭-২, মাহমুদউল্লাহ ৭-১-৪৭-১, নাসির ৩-০-১৭-০
ফল: পাকিস্তান ৩ উইকেটে জয়ী