পেটের দায়ে কয়লা টানে ওরা
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০১৪, ২৩:১০
সকাল সাড়ে ৬টা। রাজধানীর গাবতলী ঘাটে এসে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার কয়লা শ্রমিক। কয়লা টানে বলেই তাদের নাম হয়েছে ‘কয়লা শ্রমিক’। রাজধানীবাসী জেগে ওঠার আগেই জেগে ওঠেন এরা। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, আর কয়লার সংস্পর্শে এসে এই নারী শ্রমিকরাও হয়ে গেছেন কয়লার মতোই কালো। ছিপছিপে গড়নের এসব নারী বেশিদিন ঘাটে কাজ করতে পারেন না, কারণ অসুস্থতা এদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু মেলে না স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা ঘাটে কাজ করা এই নারী শ্রমিকদের জন্য নেই উপযুক্ত কর্মপরিবেশ। নেই কোন শৌচাগার বা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা।
ভোরবেলাতেই হাজারো শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে গাবতলী নৌযান ঘাট। শুধু এ ঘাটেই কাজ করছে প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি কয়লা শ্রমিক। সিলেটের জাফলং কিংবা ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে ট্রলার ও জাহাজে করে কয়লা আসে এ ঘাটে। নদীতে জোয়ার থাকলে ট্রলার ঘাটের একদম কাছে ভিড়তে পারে। আর ভাটা থাকলে ট্রলার ভিড়ে ঘাট থেকে খানিকটা দূরে। ট্রলার থেকে একটি ১৪ কিংবা ১৬ ফিটের চওড়া কাঠ ফেলে রাখা হয় ঘাট পর্যন্ত। ট্রলার থেকে এই কাঠের ওপর দিয়েই শ্রমিকরা কয়লার টুকরি মাথায় নিয়ে ঘাটে আসে এবং আরেকটি কাঠের ওপর দিয়ে কয়লা ট্রাকে তুলে দেয়। এ ভাবেই তারা কয়লা ওঠা-নামা করছেন বছরের পর বছর ধরে। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজটি করতে গিয়ে প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হন শ্রমিকরা। কিন্তু তা দেখার যেন কেউ নেই!
ঘাটে কয়লা টানা শ্রমিকদের মধ্যে অর্ধেকই নারী। মঞ্জুরা, বেবী, ফুল্লরা, জোবেদা তাদেরই কয়েকজন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন পুরুষ কয়লা শ্রমিক ২০০ টাকা মজুরি পেলেও নারীরা পায় মাত্র ১৫০ টাকা। এক টুকরি (ডালি) কয়লা ট্রলার থেকে মাথায় করে নামিয়ে ট্রাকে তুলে দেওয়ার জন্য একজন শ্রমিক পান ২ টাকা। তবে দূরত্বের ওপরও মজুরি নির্ধারিত হয়। দূরত্ব কম হলে ১ টাকা; আর বেশি হলে ৩ টাকা হিসেবে মজুরি ধরা হয়।
মঞ্জুরার বয়স আনুমানিক ৪৫। গাবতলী ঘাটে কয়লা টানার কাজ করেন তিন বছর ধরে। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ৫০/৭০ টুকরির বেশি কয়লা টানতে পারেন না। দিন শেষে তার মজুরি দাঁড়ায় ১০০ থেকে ১৪০ টাকা। তবে কোন কোন দিন এর চেয়েও কম মজুরি পান। ৩ বছর আগে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছেন। এখন চার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে মঞ্জুরা হিমসিম খাচ্ছেন।
৩/৪ মাস ধরে একই কাজ করছেন বেবী ও তার স্বামী। অভাবের কারণে গ্রাম থেকে স্বপরিবারে এসেছেন শহরে। থাকেন আমীনবাজার বস্তিতে। ঘরভাড়া দিতে হয় ২২শ’ টাকা। বেবী বলেন, ‘এখানে আমাদের জন্য খাবার পানি নেই। নেই কোন শৌচাগারের ব্যবস্থা। খুব বেশি দরকার হলে গাবতলী গরুর হাটে যেয়ে ৫ টাকার বিনিময়ে কাজ সারতে হয়।’
ফুল্লরা এই ঘাটে কাজ করেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি বলেন, ‘ছেলেরা দৌড়ে ওঠা নামা করতে পারলেও টুকরি মাথায় মেয়েরা দ্রুত উঠতে পারে না। যার কারণে নারীরা মজুরি বেশি পায় না।’ তিনি আরো বলেন, একটু পর পর পানি খাইতে ইচ্ছে করে কিন্তু খাবার পানি নাই এখানে। আর পানি খাইলে শৌচাগারে যাওয়ার দরকার হইতে পারে বলেই তারা বেশি পানি পান করেন না।
‘মিরপুর ঘাট নৌযান লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়ন’ এর সভাপতি রেজভি উদ্দিন বলেন, আমাদের এই ঘাটে ছয় হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন। এর অর্ধেক নারী শ্রমিক। ঘাটে শৌচাগার ও খাবার পানির কোন ধরনের ব্যবস্থা নাই অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এখানে ৬ কিলোমিটার এর মধ্যে কোন টিউবয়েল এর ব্যবস্থা নেই। আমাদের এসব সমস্যা দেখারও কেউ নাই। এর আগে এই এলাকার কমিশনারকে বলা হয়েছিল, তিনি আশ্বাস দিলেও শ্রমিকদের জন্য কিছুই করেননি। এখানে হঠাত্ কোন শ্রমিক আহত হলে তারা প্রাথমিক চিকিত্সার কোন সুযোগ পায় না। কিংবা তাদের জন্য বাড়তি কিছু টাকাও দেওয়া হয় না।’ রেজভি জানান, এ ঘাটে গত মাসে ৩৭৭টি ট্রলার ও ১১৬টি জাহাজ এসে ভিড়েছে। শুধু কয়লা নয়, এই ঘাট দিয়েই কখনো বালু, কখনো পাথর, চুনাপাথর আসে, সেসবও এই শ্রমিকরাই পার করে।
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ঘাট নিয়ন্ত্রণ করছেন জহির সর্দার। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের উদ্যোগে ‘দুস্থ ও আহত শ্রমিক ফান্ড’ গঠন করেছি। কোন শ্রমিক দুর্ঘটনায় পড়লে তাকে আমরা তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা বাবদ ৫০০ টাকা কিংবা মারা গেলে দাফনের ব্যবস্থা করে থাকি মাত্র। কিন্তু এর বেশি আমাদের করার সাধ্য নাই।’
শ্রমিকরা জানান, কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এখানে শ্রমিকরা দুর্ঘটনার শিকার হন। কাঠ বেয়ে ভারি টুকরি মাথায় নিয়ে আসতে গিয়ে প্রায়ই নীচে পড়ে যান নারী শ্রমিকরা। অনেকের হাত ভাঙ্গে, পা ভাঙ্গে, কিন্তু তারা প্রাথমিক চিকিত্সা পর্যন্ত পান না। ঘাটের নারী শ্রমিকরা প্রায় সবাই গুল, জর্দা কিংবা অন্য কোন নেশায় আসক্ত। তারা বলেন, ‘কিছু একটা না কাইলে সারাদিন অনাহারে পানি পান না করে থাকতাম ক্যামনে।’
নারী শ্রমিকদের এই অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. রেজাউল করিম কাজল বলেন, দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার কারণে এসব নারী শ্রমিকদের প্রশাবের রাস্তায় ইনফেকশন দেখা দেয়। এ থেকে কিডনিরও ইনফেকশন হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কারণে শতকরা ৮০ ভাগ নারী কিডনির সমস্যা ও রক্ত শূন্যতায় ভোগেন। এসব কারণে আমাদের দেশে পুরুষের তুলনায় নারীরা কিডনি রোগে আক্রান্ত হন বেশি। তিনি আরো বলেন, মুখে গুল, জর্দা রাখলে, মুখের ও ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২০ লাখ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ ও কর্মহীন হয়ে পড়েন ১২ লাখ শ্রমিক। পেশাগত রোগে আক্রান্ত হন ১৬ কোটিরও বেশি শ্রমিক।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিল্স এর তথ্যমতে, কেবল ২০১৩ সালে দেশে পেশাগত দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৯১২ জন শ্রমিক। আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৭৩৮ জন শ্রমিক। আর আহত শ্রমিকদের মধ্যে এক হাজার ৪২০ জনই নারী শ্রমিক।