‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’

প্রায় দু-দশকের অধিককাল সময় ধরে আমরা আড্ডা মারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এটাই এক সময়কার রেসকোর্স ময়দান। সেকালে এখানে ঘোড়ার দৌড় হতো। শহরের মধ্যিখানে ফাঁকা একটা মাঠ। সাম্প্রতিক সময়ে এসে এই উদ্যান এখন স্বাধীনতা উদ্যান। অন্তত গত দু-আড়াই দশকে এসে এই উদ্যান হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের তারুণ্যের মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতিচর্চার অবাধ পটভূমি। দেয়ালবন্দি প্রতিষ্ঠান কিংবা কলাকেন্দ্রগুলোর চেয়ে উদ্যানে এই ফ্রিস্টাইল স্টাডি বেশি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে—তা বাংলা কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে আগত তরুণদের জন্য যেমন সত্য, কি গান, তর্ক-বিতর্ক-দর্শন চর্চার জন্যও তা সত্য। যদিও, এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। অবশ্যই এই উদ্যানের খণ্ডকালীন বাসিন্দারা সেই স্বীকৃতির ধারই ধারে না, তারা থাকে তাদের মতোই, এই তারাই হচ্ছি আমরা। আমরা কারা? শিল্পকলা চর্চার অ্যাকাডেমিক পর্যায়ের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান চারুকলা ইনস্টিটিউট এই উদ্যানের মুখোমুখি অবস্থান করছে। সর্বোপরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা শক্তি ও ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে এখানে। আজকের তারুণ্যের সবচেয়ে প্রতিভাশীল অংশই ভিড় করে থাকে উদ্যানে বা চারুকলার মুখোমুখি যে অংশটি ছবির হাট বলে পরিচিত, তার ঘাসে ঘাসে, ধুলোর ওপরে। কেউ খোলা গলায় গান গায়, কেউ নিমজ্জিত হয় আত্মমগ্নতায়। তরুণ কবির দল ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসে, চিন্তকরা দানা বাঁধে এখানে বসেই, রাজকীয় ভবঘুরেরা ডানা মেলে এখানে এসে। এরই রিফ্লেকশন পড়ে শাহবাগে, গোটা বাংলাদেশেই। মুক্তচিন্তার প্রেক্ষাভূমি হয়ে ওঠে স্বাধীনতা উদ্যান। প্রাথমিকভাবে মনে হয়, কিছু বাউল-ভবঘুরেই বোধ হয় দখলে নিয়েছে এই মাঠ, মাঠের হাওয়া। হ্যাঁ, ছেউড়িয়ার লালন ফকির মাঠে হাজির বটে, হাজির দেরিদা-ফুঁকো-জীবনানন্দ-ফ্রয়েড-পিঙ্ক ফ্লয়েড-আহমদ ছফা-হুমায়ুন আজাদ—দুনিয়ার চিত্রকলা, সিনেমা, দাসত্ব মুক্তির ভাবনা, নেশার স্বাধীন সাম্রাজ্য। কী নেই আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে? অফিস নেই, আদালত নেই, সামাজিক শৃঙ্খলার অনুশাসন নেই। ছেলে-মেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, গড়ে উঠছে আবৃত্তির দল। আড্ডা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে লিটল ম্যাগাজিন। আড্ডায় বসেই ল্যাপটপে গড়ে উঠছে অনলাইন পোর্টাল—গড়ে উঠছে প্রেম। প্রেম ধীরে ধীরে বাঁক নিচ্ছে। বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছে আরেক প্রেমিক। সেই প্রেমিক কি এই বসন্তে ব্যথাতুরই থেকে যাবে, এই উদ্যানে, যেখানে একদিন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ডেকে এনেছিলেন কিংবদন্তী নেলসন ম্যান্ডেলা ও ইয়াসির আরাফাতকে। বর্তমান পৃথিবীতে সেই দুই রাষ্ট্রনায়ক মাদিবা বা ম্যান্ডেলা ও আরাফাত বেঁচে নেই। বাংলার কয়েকটা খণ্ড খণ্ড গঞ্জের বাজার যেন গড়ে উঠেছে মাঠে, শিখা চিরন্তনের পাশেই। বাংলাদেশই যেন কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত আছে স্বাধীনতা উদ্যানে। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারে এই মাঠেই গড়ে উঠেছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত। সাম্প্রতিককালে বড় দুই দলের জনসভাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই মাঠে। বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গানবাজনা চলতেই থাকে মাঠে। সন্ধ্যায় যেন ভিড় লেগে যায় গানে গানে, কবিতায়, তারুণ্যের বাঁধভাঙা জোয়ারে। নগরবাসীর কাছে এই মাঠ প্রায় মিথ হতে চলেছে। আমরা মিথের মধ্যে থাকি। চলমান আমরাই মিথ হয়ে যাই, মিথ হয়ে উঠি। পহেলা বৈশাখ-একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ বা ঢাকায় বড় কোনো উত্সব হলেই নগরবাসী এসে এই মাঠে ভরে যায়। কেন আসে তারা? ধারণা করি, সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে যে আপাত-পরাধীনতা বিদ্যমান থাকে, নগরবাসী তাই একটু স্বাধীন হতে চেয়ে চলে আসে এইখানে। শিখা অনির্বাণের আগুনে নিজেকে হয়তো সেঁকে নিয়ে যেতে চায় তারা। কারণ জীবনে জ্বলে উঠতেই হবে। নিভে থাকা জীবন কোনো জীবন নয়, এ মানুষ জানে। কিন্তু জ্বলে উঠার অভিপ্রায়ে এই মাঠই কেন? আজকের তারুণ্যের সবচেয়ে স্বাধীন ও প্রতিভাশীল অংশই এই উদ্যানে কেন? পূর্ত মন্ত্রণালয় কি জানে না, কী হচ্ছে এখানে? কী হয় এখানে? জানে জানে, সব জানে। নিজেরা পেরেছি কিছু, বাকিটা তরুণেরা পারুক, করুক, এই মর্মে জানে সম্ভবত। তাই বিষণ্ন ঈগলের ডানার মতো এই মাঠে ওড়াউড়ি করে ঝাঁক ঝাঁক ছেলেমেয়ে। ইতোমধ্যেই অফিস-আদালতে ঢুকে পড়া অনেকেই বিকালে বা সন্ধ্যায় অফিস থেকে বেরিয়ে বাসায় না গিয়ে চলে আসে এই মাঠে, শুধুই কি হাওয়া খেতে? হাওয়ার ভেতরে আর কী কী থাকে? গান-কবিতা-ছবি-স্বপ্ন-ধোঁয়া... আর কী কী থাকে? স্বাধীনতা থাকে—এইটুকু আমরা জানি। আমরা কারা? আমরা বাঙালি। বাংলাদেশের বাঙালি। একটি স্বাধীন জাতি। কীভাবে, কখন আমরা স্বাধীন হলাম? স্বাধীনতা কাকে বলে? পরাধীনতা কাকে বলে? পরাধীনতার দমন-পীড়ন কেমন? স্বাধীনতার আস্বাদ কেমন? মন যা চায়, তা পেলেই তো স্বাধীনতা, সেটা কোথায় পাওয়া যায়? উদ্যানে পাওয়া যায়। সম্পূর্ণটা? তা হয়তো নয়, তবে অনেকটাই। যা বলছিলাম, আমরা যে ১৯৭১ সালে প্রাণক্ষয়ী একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা পেলাম, তার আদ্যোপান্ত আমাদের জানা আছে। আমাদের জানা আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা। সেটা কি শুধুই ভাষণ? ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’, এটা কি বাঙালির জীবনে একটা সাংবিধানিক সত্যে পরিণত করবার নির্দেশনামা নয়? সামনের দিকে স্বাধীনভাবে চলবার সূচনামন্ত্র নয়? ৭ মার্চ, ১৯৭১। সেদিনের রেসকোর্সের মাঠে বঙ্গবন্ধু লাখো বাঙালির সামনে দাঁড়িয়ে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে যে হুমকি দিলেন, বাঙালিকে যে নির্দেশ দিলেন স্বাধীন হওয়ার প্ররোচনায়, তা একটি ইতিহাস। সত্য ইতিহাস। পৃথিবী তা দেখেছে, শুনেছে। সেটা ঘটেছিল এই মাঠে, এই উন্মুক্ত প্রান্তরে। ফলে, সেই মার্চেরই ২৫ তারিখ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটের নামে যে বীভত্স হত্যাযজ্ঞ ঘটাল নিরীহ বাঙালির ওপর, অগ্নিসংযোগ করল রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, পিলখানা ধ্বংস করতে সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি করল এবং ২৬ মার্চ থেকেই বাঙালি যার ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াল—এই ইতিহাস সবারই জানা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তাই শুধু ভাষণ হয়ে থাকেনি আমাদের জীবনে, বরং বাঙালির জীবনের অন্তর্গত সাংবিধানিক নির্দেশ-কাঠামো হয়ে থাকল—‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’ এ যেন এক মন্ত্রবাণী আমাদের জীবনে, পৃথিবীতে বাঙালির জীবনে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে আমরা বলি স্বাধীনতা উদ্যান। একসময় ছিল রেসকোর্স ময়দান। হয়তো কেউ একজন বলবে, এই মাঠ স্বাধীনতার মাঠ। এই উদ্যান স্বাধীনতার উদ্যান। আমি বলব, ৭ মার্চ উদ্যান। ৭ মার্চ উদ্যান বলতেই, আমার চোখে ভেসে উঠছে শাদা-কালো ফুটেজের সেই দৃশ্যাবলি—লাখ লাখ বাঙালির সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর আঙুল উঁচিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন, একটি জাতি পরাধীন থেকে স্বাধীন হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, যুদ্ধের জন্য সংকল্পবদ্ধ হচ্ছে। এবং হলোও তা-ই। ৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের জন্য এই মাঠ, এই উদ্যান বাঙালির জাতিসত্তায় মিশে গেছে। শিখা অনির্বাণের আলো জ্বলছে মাঠে, মাঠের গাছগুলো দাঁড়িয়ে দেখছে আজকের তারুণ্যের স্বাধীনতা। আমাদের কখনোই ভোলার সুযোগ নেই এই ইতিহাস—মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে কথা বলে দিয়েছেন প্রতিটি বাঙালির জন্য। ৭ মার্চ, মার্চের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ঐতিহাসিক এই উদ্যানের ভূমিকা কতখানি আমাদের জীবনে—তা এক কথায় বলবার নয়। আমরা মাঠে থাকি, আমরা স্বাধীন হতে লড়াই করি। আমরা স্বপ্ন দেখি, কবিতা লিখি, ছবি আঁকি। ছবি বানাই, আমরা ভালোবাসি দেশকে, তোমাকেও। মনে রেখো তুমিও।