চলচ্চিত্র ‘জীবনঢুলী’
রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০১৪, ১৭:২৭
দেশের বাণিজ্যিক ধারার যেসব চলচ্চিত্রকে নির্মাণ ও পৃষ্ঠপোষক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে জনপ্রিয় বলে দাবি করা হয়, পরিতাপের বিষয়, এখন পর্যন্ত সেসব চলচ্চিত্রের অল্প কয়েকটিই মুক্তিযুদ্ধের সার্থক উপস্থাপন করতে পেরেছে। একটি জাতির এমন গৌরবময় ইতিহাস এই শিল্পমাধ্যমে অবহেলিত। ১৯৭১-এ ঘটে যাওয়া বহু নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্যে খুলনার চুকনগর গণহত্যা অন্যতম যেখানে সহস্রাধিক নিরস্ত্র নিম্নবর্ণের সংখ্যালঘুকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে হত্যা করে। আর এই ইতিহাসকেই কেন্দ্রে রেখে নির্মিত হয়েছে তানভীর মোকাম্মেল-এর নতুন চলচ্চিত্র ‘জীবনঢুলী’। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাগণ আর্থিক সংকটের কারণে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি সেলুলয়েডে বড় পরিসরে চিত্রায়িত করতে পারেনি। ইতোমধ্যে জীবনঢুলী চলচ্চিত্রটি ৩টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশগ্রহণ করেছে। নিম্নবর্ণের নমশূদ্র সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং তাদের শরণার্থী হওয়ার যাত্রা চিত্রায়িত হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রটির কাহিনি এগিয়েছে একজন নমশূদ্র ঢাকীকে নিয়ে, যে তার সর্বস্ব হারায়। পরিচালক খুব সোজা এবং সফলভাবেই কাহিনির ধারা বর্ণনার মাধ্যমে গণহত্যার ভয়াবহতা ও এর পরবর্তী প্রভাব চলচ্চিত্রে প্রদর্শন করেছেন।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা বাঙালিদের ওপর সৃষ্ট বৈষম্য বাঙালিদের নিজস্ব জাতিসত্তা খুঁজতে জাতীয়তাবাদে জাগ্রত করে তোলে, যার ফলে বিরাট এবং অকল্পনীয় এক আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ও সাবভৌম রাষ্ট্র অর্জিত হয়। যুদ্ধের সময় মানবতার চরম বিপর্যয় ঘটে। এর সত্যতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ-বিগ্রহ ও গণহত্যাসমূহ পর্যালোচনা করলে উপলব্ধি করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ, আলজেরিয়ার গণহত্যা, রোয়ান্ডার গণহত্যা, সুদানের দারফুরের গণহত্যা নিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও ১৯৭১-এ আমাদের এ অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের বাঙালি গণহত্যা নিয়ে তেমন মানসম্পন্ন ছবি নির্মিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সেই অসাম্প্রদায়িকতা এবং জাতীয়তাবাদের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখতে এবং জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিল্পমানের চলচ্চিত্র অবশ্যই অপরিহার্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই কমবেশি বিপন্ন অবস্থার শিকার হয়েছিল, আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়। জীবনঢুলীর কাহিনি উপাদান নিম্নবর্ণের হিন্দু যারা ১৯৭১-এ অনেক বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। সাধারণত নিম্নবর্ণের মানুষ সমাজের উচ্চবর্ণ এবং সংখ্যাগুরুদের দ্বারা নানাভাবে লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়, যে কারণে এরা একটু চুপচাপ ও নিরীহ প্রকৃতির হয়ে থাকে। এরা তেমন প্রতিবাদমুখর নয়, সমস্ত ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায়। আর নেহায়েত অন্যায়-অবিচারের শিকার হলেও মুখ বুজে সহ্য করে যায়। আর এমনই চরিত্র জীবনঢুলীতে চিত্রায়িত হয়েছে। এ চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র জীবনকৃষ্ণ দাস ঠিক এমনই একজন ব্যক্তি যে শুধু তার শিল্পসত্তা নিয়ে বেঁচে থাকে, যুদ্ধ শুরুর আভাস নিয়ে গ্রামে নানাবিধ কথা-বার্তা চলতে থাকলেও সে এসব নিয়ে কোনো কথা বলার আগ্রহ দেখায় না। একদিন তার কাকা তাকে উদ্বেগের কথা জানালে সে এসব ব্যাপারে অহেতুক চিন্তা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়। এমনকি পূজা-পরবর্তী জমিদার বাড়িতে ভোজের সময় উচ্চবর্ণের ব্যক্তিগণ এরূপ অনিশ্চয়তার পূর্বাভাস নিয়ে আলোচনা করলেও তাকে এসব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। পরিচালক খুব সুন্দরভাবে চরিত্রটি বাস্তবতার নিরিখে ফুটিয়ে তুলেছেন।
একজন সংখ্যালঘু নিম্নবর্ণের ব্যক্তির মধ্যে হীনন্মন্যতা কাজ করবে এবং বাঁচার তাগিদে কিংবা লাঞ্ছনা-বঞ্চনা থেকে মুক্ত থাকতে অন্যের প্রতি সহজে বশ্যতা ও আনুগত্য প্রদর্শন করবে—এটাই স্বাভাবিক। আর এ সমস্ত উপাদান সবগুলোই জীবনকৃষ্ণ চরিত্রের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। ছবিতে দেখা যায়, জীবনকৃষ্ণ মুক্তিযুদ্ধে পরিবার-পরিজন হারানোর পর আরো নিশ্চুপ হয়ে যায় এবং হিন্দু লোক-শূন্য গ্রামে ফিরে আসার পর সে তারই গ্রামের রাজাকার ক্যাম্পে রাজাকার সদস্যদের উত্সাহ জোগাতে ঢোল বাজানোর কাজ পায়। তার জায়গায় সমাজের অন্য শ্রেণীর কোনো লোক হলে হয়তো রাজাকার ক্যাম্পে কাজ করার পরিবর্তে আপনজন হত্যার প্রতিশোধে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোগদান কিংবা নিজ উদ্যোগে রাজাকার বা হানাদার হত্যায় আত্মনিয়োগ করত। একজন নিরীহ সাধারণ নিম্নবর্গের ব্যক্তি যার প্রতিবাদের ভাষা এই তথাকথিত সমাজব্যবস্থায় বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তারপরেও নিজের যে শিল্পসত্তা ছিল সেই শিল্পসত্ত্বাকে বিসর্জন দিতে হয় সেই মহাদুর্ভোগের সময়, হয়তো শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে। সভ্য সমাজে অবহেলিত এই মানুষগুলো মানবেতর অবস্থায় বেড়ে ওঠার পরও যুদ্ধকালীন যে মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তার যথার্থ চিত্র তানভীর মোকাম্মেল তাঁর জীবনঢুলী চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে সুন্দরভাবে এঁকেছেন এবং তা অবশ্যই নতুন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মাইলফলক হয়ে থাকবে।