বেঙ্গল গ্যালারিতে শিল্পী নাজমা আক্তারের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী

সঙ্গীত ও কাব্যের ঐক্যতান

ঢাকার ধানমণ্ডিস্থ বেঙ্গল গ্যালারিতে শিল্পী নাজমা আক্তারের ‘কত অজানারে জানাইতে চাই’ শীর্ষক একক চিত্রকলা প্রদর্শনী ১ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। দশদিন ব্যাপী এই চিত্রপ্রদর্শনীতে মোট ৬১টি চিত্রকর্ম রয়েছে। উল্লেখ্য, আশির দশক থেকে বাংলাদেশে যে কজন হাতে গোনা নারী চিত্রশিল্পী আবির্ভূত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নাজমা আক্তার অন্যতম। কুমিল্লার এক মফস্বল শহরের বাল্যস্মৃতি, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন তাঁর অভিজ্ঞতার অনবদ্য সঞ্চয়; যা তাঁর চিত্রকলার বিষয় ও ফর্মের অবচেতনে সঞ্চরণশীল। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি নিরীক্ষাধর্মী বিমূর্ত শিল্পধারার সার্থক প্রতিনিধি। কাগজ, ক্যানভাস আর রঙ-তুলি তাঁর প্রিয় উপকরণ। সমাজ-সংসার ও পেশাগত জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি শিল্পচর্চায় নিবেদিত। দেশ-বিদেশে পরিচিত এই চিত্রশিল্পীর শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শিল্পবোদ্ধাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে পেয়েছেন রশীদ চৌধুরী মেমোরিয়াল পুরস্কার, এর আগে তিনি ১৯৮১-৮২ দু-বছর চিত্র অঙ্কনে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জনে সক্ষম হন। ২০০৬ সাল থেকে তাঁর একক চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনী হয়ে আসছে। ‘রঙে-বর্ণে’ সূচিত তাঁর একক প্রদর্শনীগুলো ‘নৈঃশব্দ্যের কথকতা’ হয়ে ‘ফেরারী ছায়া’র পথ পাড়ি দিয়েছে। তিনি ১৯৭৮ থেকে এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশের বিখ্যাত বিখ্যাত চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে খ্যাতিমানদের সঙ্গে তাঁর নিজের চিত্রকর্মকে বোদ্ধামহলে পরিচিত করে তুলেছেন। তিনি চিত্রের মধ্য থেকেই বুঝেছেন প্রাচ্য ধারাতে আধুনিক জীবনের রূপায়ণ দুঃসাধ্য না হলেও সাম্প্রতিক অনুভববেদ্যতা প্রকাশে সব সময় উপযোগী নয়। এজন্য ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষায় নিয়োজিত হয়েছেন। রঙ ও বুনন নিয়ে বিমূর্ত চিত্রকলায় নিজেকে নিযুক্ত করেছেন। নাজমা আক্তারের নিজের কথা থেকে আমরা জানতে পারি, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রাচ্য শিল্পকলা বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের শেষ তিন বছরে বিমূর্ত শিল্পচর্চায় নিয়োজিত থেকেছেন। মানুষ ও প্রকৃতিকে রেখায়িত করার জন্য কেবল প্রাচ্য শিল্পের ঐতিহ্য নয়, তিনি আত্মস্থ করেন পাশ্চাত্য শিল্পরীতির আধুনিকতাবাদ। মৃত্তিকা সম্ভূত শিল্পধারার প্রকৃত বর্ণশোভায় স্নিগ্ধ ও প্রশান্তি আত্মপ্রকাশ করেছে তাঁর চিন্তায়। শৈশব কেটেছে স্মৃতিময় গ্রামে। তিনি সেখান থেকেই তাঁর উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। প্রদর্শিত ছবিগুলোতে বিমূর্ত কারুকাজের ভেতর দিয়ে সজীব হয়ে উঠেছে সেই স্মৃতিময়তা। গ্রামীণ জীবনের রঙের সৌরভে তিনি আন্দোলিত হয়েছেন। বিমূর্ত চিত্রকলায় তিনি নিজেকে নিবেদিত করেছেন রঙের মধ্য দিয়ে। কালোর প্রাধান্যে নাগরিক জীবন ও ফেলে আসা স্মৃতির সংহত বিন্যাসে, চাঁদনী পসরার সৈকতে নাজমা আক্তার কখনো কখনো অ্যাক্রেলিক আর মিশ্রমাধ্যমেও নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। প্রদর্শিত ছবিগুলোর মধ্যে নাজমা আক্তারের একটি চিত্রের নাম ‘এ ডে অব রেড, গ্রে অ্যান্ড ব্লাক’। কালো ও ধূসর ক্যানভাস দিয়ে লাল রক্তের ধারা নেমে এসেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে এভাবেই এঁকেছেন শিল্পী। রক্তের ধারাপাতে সোজা, বাঁকা রেখার বিন্যাস এবং পুরো পটভূমি জুড়ে নির্মাণ কুশলতা চিত্রটিকে নান্দনিক করে তুলেছে। মূলত তাঁর বিমূর্ত চিত্রকলায় বস্তুর প্রতিমূর্তি প্রকাশ করে না, বরং নান্দনিক অনুভূতি প্রকাশ করে। তাঁর ছবিগুলো দর্শককে কেবল স্বস্তি দেয় না, জীবনের ইতিবাচক স্বরকেও তুলে ধরে। রঙের ব্যবহারে তিনি অনন্য। কালোর পাশাপাশি স্বচ্ছ ও সজীব রঙের উপস্থিতি তাঁর চিত্রকলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি প্রকৃতি থেকে বর্ণ অন্বেষণ করে নিয়েছেন, যেখানে কখনো বিবর্ণতার প্রাধান্য নেই। ‘দি গ্রিন স্কাই ওভার কাঠমান্ডু’ ছবিটি এর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। তাঁর ছবির ফর্ম সহজ-সরল, জ্যামিতিক বিষয়বস্তুর সাযুজ্যে অনবদ্য। ছবিগুলোর গড়নই বলে দেয় বিমূর্তের ভেতরকার অর্থ। ব্যঞ্জিত হয় সুর ও ঝঙ্কার। নগরের অনুভববেদ্যতা আর গ্রামীণ জীবনের স্বাধীনতা রঙ, রেখায় এবং স্মৃতিকাতরতায় অনন্য হয়ে উঠেছে। নাজমা আক্তারের পৃথিবীতে দর্শকরা খুঁজে পান নিভৃত সুখ, স্মৃতির জাদু। মূলত নাজমা আক্তারের শিল্পকর্ম সংগীত ও কাব্যিকতার সঙ্গে রাখীবন্ধন পরেই বিকশিত আর মূর্ত হয়েছে। প্রদর্শিত ছবিগুলোর রঙের ব্যবহার কিছুটা ডার্ক। কালো আর লালের মিশ্রণ করেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আবার সেখানে আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার ও ফর্মের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। ছবিতে রঙ, স্পেস ও ফর্মের ব্যঞ্জনায় শুধু চাক্ষুষ নান্দনিক আনন্দ নয়, বরং মানুষের অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রান্ত হয়ে অনাবিল আনন্দঘন সুখানুভূতি সৃষ্টি করাই যেন তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি নির্বস্তুক চিত্রকে নৈর্ব্যক্তিকতা থেকে উদ্ধার করে, নির্বস্তুকতার ক্ষমতাকে আরো সম্প্রসারিত করে মানব অভিজ্ঞতাকে বোধগম্য স্তরে সঞ্চারিত করেছেন। বিমূর্ততা ও মূর্ততা এই দুয়ের সীমারেখা নির্ধারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে চলেছেন। তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সংবেদনশীল শিল্পী। তাঁর ছবিগুলো দর্শককে আনন্দঘন অভিজ্ঞতার আলোকে সিক্ত করবে বলে আমার বিশ্বাস।