উন্নত বিশ্বে চাকরির বাজারে ডিগ্রি এখন বড় ফ্যাক্টর

ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা কিথ এন্ডারসন বাবা-মার কথা শোনেননি। তাদের চাপাচাপি সত্ত্বেও মাধ্যমিকের পর পড়াশোনাটা আর চালিয়ে যাননি। এর খেসারত তাকে এখন দিতে হচ্ছে। ছয় মাস ধরে কাজের সন্ধান করছেন; কিন্তু কেউ তাকে কাজ দিতে চাচ্ছে না। তিনি লক্ষ্য করছেন, যারা অন্তত কলেজের পড়াশোনাটা সমাপ্ত করেছেন তারা ঠিকই ঢুকে পড়েছে কর্মজীবনে। এ নিয়ে এখন কিথের আফসোসের সীমা নেই। আসল কথা হল— প্রত্যাশামাফিক নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু কম শিক্ষিতরা রয়েছে বেকায়দায়। চাকরির বাজারে তাদের খুব একটা কদর নেই। শুধু তাই নয়, কলেজ-শিক্ষিত শ্রমিক এবং মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণকারী শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি ও আয়ের ব্যবধান ক্রমশই বাড়ছে। আর এ অবস্থাটা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, উন্নত বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই। এ সম্পর্কে প্যারিস-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক অর্গানাইজেশন ফর ইকোনোমিক কো-অপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর আন্দ্রিয়ান শ্লাইচার বলছিলেন, ‘চাকরির বাজারে উচ্চ শিক্ষিতরা একটু নয়, বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে এবং এ সমস্যাটা সহসাই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তো নেই-ই; উপরন্তু দিনে দিনে আরও বাড়বে। ইউএস ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিসটিকস-এর তথ্যানুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েটদের সাত দশমিক চার শতাংশ বেকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা তিন দশমিক আট শতাংশ। প্রায় একই অবস্থা ইউরোপেও। ইউরোস্ট্যাট জানিয়েছে, ২০১২ সালে ইউরোজোনের ২৭টি দেশে মোট বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের আশ-পাশে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম, ৬ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটরা চাকরির বাজারে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ইউরোপে ২৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মাধ্যমিক পাস বেকার লোক কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট বেকারদের চেয়ে অনেক বেশি। এমনিতেই সেখানে মোট বেকারত্বের হারের তুলনায় ২৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার দুই দশমিক ছয় গুণ বেশি। তবে অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের চাকরির বেলায় উচ্চ শিক্ষা তেমন একটা প্রভাব ফেলছে না। স্পেনে ২০১৬ সাল নাগাদ বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশের আশ-পাশে থাকবে। কিন্তু এখানে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এ হার থাকবে ১৭ শতাংশের মতো। এখানে অবশ্য একটা কথা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী সব বয়সীদের বেলায় সমান সুবিধা এনে দেয় না। স্পেনের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস জানিয়েছে, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট বেকার আর এ সংখ্যাটি বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট সার্বিক বেকারের হারের চেয়ে অনেক বেশি। অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের চাকরির ক্ষেত্রে ডিগ্রী তেমন একটা প্রভাব ফেলছে না। কিন্তু তরুণরা চাকরি চাইতে গেলেই দেখা হচ্ছে, তারা কতদূর পড়াশোনা করেছে এবং কোত্থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছে। মাদ্রিদের অটোনমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বলেছেন, ‘স্পেনে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রীধারী এমন সব কাজ করছে, যেগুলোয় তাদের অর্জিত শিক্ষা কোনও কাজে আসছে না। ওসব কাজের জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র কারিগরি শিক্ষা। উন্নত রাষ্ট্র না হলেও চাকরির ক্ষেত্রে ডিগ্রীর গুরুত্ব আলোচনায় চীনের কথা এসে যায়। সেখানকার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। ২৫ বছরের কম বয়সীদের মাঝে কলেজ গ্র্যাজুয়েটরাই বেকারত্বের শিকার সবচেয়ে বেশি, ১৬.৪%। অথচ তরুণ হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েটরা এতো বেশি বেকার নয়। তবে সার্বিক বিচারে কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য পরিস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক নয়। সব বয়স বিবেচনায় আনলে চীনে কলেজ গ্র্যাজুয়েট বেকার লোক খুব একটা বেশি নয়, মাত্র তিন দশমিক ছয়। অথচ হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা ১০ শতাংশ। চাকরির ব্যাপারে ডিগ্রীর গুরুত্বের প্রশ্নে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেসব দেশে শিক্ষা পদ্ধতি খুবই শক্তিশালী এবং অর্থনীতি খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে সেসব দেশের চাকরির বাজারেও ডিগ্রী ভূমিকা রাখছে, তবে তা খুব বেশি নয়। জার্মানিতে বিভিন্ন কোম্পানির ম্যানেজাররা যে কোনও শ্রমিককেই কাজ দিতে আগ্রহী থাকে। এমনকি অনেকে কাজ দেয়ার আগে শ্রমিকদের শিক্ষার স্তর সম্পর্কে প্রশ্ন পর্যন্ত করে না। তবে উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এমন অবস্থা নেই। সর্বনিম্ন স্তরের চাকরির জন্যেও কমপক্ষে কলেজ ডিগ্রী কামনা করা হয়। এখানেই শেষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রে হাই স্কুল পাস করা একজন লোকের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট একজন লোকের জীবনে মোট আয়ের সম্ভাবনা ২০০ শতাংশ বেশি। কিথের করুণ অবস্থা দেখে কিথের স্কুল পড়ুয়া ছোট ভাই জোসেফ পণ করে ফেলেছে, সে যে করেই হোক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়বে। কারণ, সে ভাইয়ের মতো বেকারত্বের জ্বালা সইতে নারাজ। পড়াশোনা শেষ করার জন্য প্রয়োজনে সে সরকারি ঋণ গ্রহণ করবে। অবশ্য সে জানে যে, সেই ঋণ পরিশোধ করতে অনেক দিন লেগে যাবে। ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত নিজস্ব বাড়ি-গাড়ির কথা ভাবতেই পারবে না সে। —বিবিসি ওয়েবসাইট অনুসরণে