আকর্ষণীয় ফলাফল নয়, প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা

পরীক্ষায় ভালো ফলাফল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের অবশ্যই কাম্য। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় সামষ্টিক ফলাফলে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করে। গত ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা-২০১৩তে স্মরণকালের সেরা সাফল্য দেখিয়েছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তারা শতকরা নিরানব্বই ভাগেরও বেশি উত্তীর্ণ হয়েছে। এ পরীক্ষাটাই সংখ্যার বিবেচনায় সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা। উত্তীর্ণের হারের বিবেচনায় সর্ববৃহত্ এ পাবলিক পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা যায়, শতকরা একভাগেরও কম যেসব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে তারা মূলত বিভিন্ন কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি বা করতে পারেনি। সরকার কোমলমতি এ শিক্ষার্থীদের ওপর সৃজনশীল পদ্ধতির আংশিক ব্যবহার করে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাইয়ের কাজও করেছে। সেক্ষেত্রে প্রতীয়মান হয়—কারো কারো মতবিরোধ থাকলেও সবচেয়ে নবীন শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এ ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রয়োগ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবনাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেবে নিঃসন্দেহে। সরকারের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্যের হার শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা শতভাগ পূর্ণ হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা-২০১৩তে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার জন্য কোনো শিক্ষাবোর্ড নেই। শুরুতে স্ব স্ব উপজেলা/থানা পরীক্ষা পরিচালনা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফলাফল শিট তৈরি করতো। বর্তমানে পরীক্ষা পরিচালনা আগের মতো আছে কিন্তু লিখিত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন নিকটবর্তী উপজেলা/থানার শিক্ষকবৃন্দ। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল শিট তৈরি করেন শিক্ষার্থীরা যে উপজেলা/থানার অধীনে পরীক্ষা দেয় সেখানকার শিক্ষকবৃন্দ। উত্তরপত্র মূল্যায়নের সঙ্গে ফলাফল তৈরির নম্বরতালিকার সামঞ্জস্য আছে কিনা তা দেখার মতো কোনো তৃতীয় পক্ষ বা যাচাইকারী নেই। স্বল্প সময়ে এত নিখুঁতভাবে ফলাফল তৈরি ও প্রকাশ শিক্ষাবোর্ড বা অন্য কোনো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও দেখাতে পারছে না। আমাদের দেশে বিশেষ করে শহরগুলোতে দরিদ্র, কম শিক্ষিত বা অশিক্ষিত অভিভাবকদের ছেলেমেয়েরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। উপজেলাগুলোতেও এ চিত্র দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয় থেকেও শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত সব ধরনের শিক্ষার্থীর একসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অভূতপূর্ব সাফল্য যথাযথ মানসম্পন্ন হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। তাছাড়া গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ঠিকমতো শ্রেণি পাঠদান সম্ভব হয়নি এবং পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষাও নেওয়া সম্ভব হয়নি। যদি সব পরিস্থিতি অনুকূলে থাকতো তাহলে প্রায় শতভাগ না হয়ে হয়তো শতভাগ শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতো। যদি সবাই উত্তীর্ণ বা অনুত্তীর্ণ হয় তাহলে মাপটা কতটা যৌক্তিক তা ভাবা দরকার। অর্থাত্ গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষায় যাতে শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হতে পারে সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের নজর দেওয়াটা জরুরি। বিশ্বায়নের যুগে টিকতে হলে শুধু প্রদর্শনযোগ্য আকর্ষণীয় ফলাফল নয় বরং মানসম্মত শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ঢাকা