শহীদ মিনার অবমাননা
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৪, ২১:০৫
১৯ ফেব্রুয়ারি কিছু মুখোশধারী দুর্বৃত্ত গভীর রাতে গুঁড়িয়ে দিলো কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৫০ বছর পুরানো শহীদ মিনার। গুঁড়িয়ে দিলো পাবনার চাটমোহর উপজেলার বোয়াইলমারী উচ্চ বিদ্যালয় ও বোয়াইলমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী শহীদ মিনার। ২০ ফেব্রুয়ারি ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আবারও একই ঘটনা ঘটলো। লক্ষ্যস্থল এবার মাহেন্দ্রপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। একই দিন-রাতে নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে আরো চারটি শহীদ মিনার ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। পত্রিকার পাতায় খবরগুলো পড়ে মনটা প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে—এই স্বাধীন দেশে এও কি সম্ভব? স্বাধীনতার আগে এই ঘটনা প্রায়শই ঘটতো। পাক-শাসকেরা বাঙালি জাতিসত্তাকে আহত করতে, তাদের শোর্য-বীর্যকে উপহাস করতে কিংবা নৈতিকভাবে দুর্বল করতে পুলিশ লেলিয়ে হরহামেশা শহীদ মিনারে হামলা চালাতো। মানলাম, পরাধীন ছিলাম। তাই এমনটি ঘটতো। কিন্তু এখন তো পাক-শাসকেরা নেই। তবু কেন এমনটি হচ্ছে? সত্যি বলতে কী, একাত্তরে পরাজয় স্বীকারটা পাক হানাদার বাহিনীই কেবল করেছে। কিন্তু তাদের এদেশি দোসররা এখনো করেনি। মুখে করলেও মন থেকে কখনো আমাদের এই স্বাধীন সত্তাকে মেনে নিতে পারেনি। নইলে সুযোগ পেলেই তারা ফণা তুলবে কেন? মাস কয়েক আগেও বিরোধী দলের আন্দোলনের সময় দেশের বহু জায়গায় শহীদ মিনার আক্রান্ত হয়েছে। এখনো একাত্তরের মতো স্থানে স্থানে সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে। চলছে ঘরবাড়ি-মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর।
একাত্তরের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ওই অপশক্তির স্বাধীনতাবিরোধী সত্তার জাগতিক নিষ্ক্রিয়তা এসেছে বটে। কিন্তু আত্মিক বা মানসিক নিষ্ক্রিয়তা বোধহয় এখনো আসেনি। নইলে স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও শহীদ মিনার ভাঙার আস্পর্ধা তাদের হয় কী করে? তাও আবার মহান ২১ ফেব্রুয়ারির ঠিক আগে আগে। দিনের আলোতে ওই অপশক্তি শীতনিদ্রায় থাকে। জেগে ওঠে রাতের ঘন ঘোর অন্ধকারে, পৈশাচিকরূপে।
গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকতেই পারে। এটা স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় থাকে—যে সব বিষয়ে সর্বসাধারণ দ্ব্যর্থহীন, দ্বিধাহীন। বাহান্ন, একাত্তর—আমাদের তেমন বিষয়। শহীদ মিনার কেবল বাহান্নর স্মৃতিবিজড়িত স্তম্ভ নয়, আমাদের স্বাধীনতার ভিতও এই মিনারের বেদীমূলে সুগভীরভাবে প্রোথিত। গণরাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এইসব বিষয়ের বিরোধিতা মানে কার্যত গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধিতা। শহীদ মিনারকে অবমাননা মানে আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তাকেই অবমাননা। আর একাত্তরের পরাজিত শক্তি সেই কাজটাই পরম দুঃসাহসে বার বার করে যাচ্ছে। শহীদ মিনারের তাত্পর্য এখানেই শেষ নয়। এ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়। এ বাঙালির মিলিত শক্তির প্রতীক। জাতিগত শোর্য-বীর্য ও সাহসের প্রতীক। এ বাঙালির সব আন্দোলন-সংগ্রামের বীজতলা। জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে এই শহীদ মিনারের পাদদেশ থেকেই উচ্চারিত হয়েছে অভয়মন্ত্র। উচ্চারিত হয়েছে শপথের বাণী। তাছাড়া ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে ছাপিয়ে এ শহীদ মিনার এখন পরিণত হয়েছে বাঙালি চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দিনে দিনে পরিণত হয়েছে এ দেশের মানুষের স্বাজাত্যবোধ, মুক্তচিন্তা ও সাম্য-শান্তির স্মারকে। এমন ঐতিহ্য ও তাত্পর্যমণ্ডিত শহীদ মিনারে হামলা বা ভাংচুরকে তাই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এ দুর্বৃত্তপনায় যারা জড়িত, তারা এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। ওই অপশক্তিকে কেবল কঠোর হাতে দমন করলেই হবে না, এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণও এখন সময়ের দাবি। আমরা ওই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বা ওইসব দুর্বৃত্তপনার নিপাত দেখতে একান্ত উন্মুখ।
ঢাকা