চাল উদ্বৃত্ত, তবু বন্ধ হয়নি আমদানি

দেশে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। অথচ খুশি না হয়ে দিশাহারা কৃষক। কারণ তারা কষ্টার্জিত ফসলের দাম পাচ্ছে না। চলতি বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান ন্যূনতম ২শ টাকা। দেশে চাহিদার তুলনায় গত কয়েক বছর ধরেই ধানের উত্পাদন বাড়ছে। অথচ একই সময়ে ব্যাপকভাবে চাল আমদানি করা হচ্ছে। ফলে চাহিদা না থাকায় ধানের বাজারে ধস নেমেছে। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন কৃষক তার উত্পাদিত ফসলের দাম পাচ্ছে না, তখন কীভাবে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। আবার এখন উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানির কথা বলা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত রবিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, কৃষকদের বাঁচাতে ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাল রপ্তানি করা হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে আউশ, আমন ও বোরো মিলে মোট তিন কোটি ৬৪ লাখ টন চাল উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে         আউশ মৌসুমে ২৯ লাখ ২০ হাজার টন ও আমনে এক কোটি ৪৩ লাখ টন চাল উত্পাদিত হয়েছে। বোরোর বাম্পার ফলনে উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা খুব সহজেই পূরণ হয়ে যাবে।

গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উত্পাদন হয় তিন কোটি ৪৭ লাখ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন কোটি ৩৮ লাখ টন আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উত্পাদন হয় তিন কোটি ৬২ লাখ টন। এ বছর চালের উত্পাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ বলেছে, বিশ্বে এ বছর ধানের উত্পাদন সবচেয়ে বেড়েছে বাংলাদেশে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর দেশে চালের চাহিদা প্রায় ৩ কোটি টন। এ হিসেবে গত কয়েক বছর ধরেই দেশে উদ্বৃত্ত চাল থাকছে, তাহলে কেন আমদানি বন্ধ করা হয়নি বা সীমিত করা হচ্ছে না। তাহলে তো কৃষকের এ দুরবস্থা হতো না। বিশ্বব্যাংক বলেছে, পরপর কয়েক বছর ধানের বাম্পার ফলনের ফলে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে; কিন্তু কৃষকের জীবনমানের কোনো উন্নতি নেই। তাদের ভাগ্য বদলাচ্ছে না।

দুই বছরে ৬০ লাখ টন চাল আমদানি: মূলত ২০১৭ সালে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় ফসলের ক্ষতির পর চালের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ১২ থেকে ১৫ লাখ টনের মতো ফসল নষ্ট হয় বলে জানানো হয়; কিন্তু আমদানি শুল্ক উঠিয়ে নেওয়ার পর গত দুই বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়। গত বছর নভেম্বরে সরকার আবার চালের উপর ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করে; কিন্তু এখনো সমানতালে চাল আমদানি হচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহত্ দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গত দেড় মাসে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টন চাল। এই বন্দর দিয়ে দিনে গড়ে ৩শ টন চাল ঢুকছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, দেশে এখন ধানের দাম অস্বাভাবিক কম; কিন্তু এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা কঠিন। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে পারলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত; কিন্তু এটা সম্ভব নয়। কারণ কৃষকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলের কর্মী, খাদ্য বিভাগের লোকজন, ব্যবসায়ীরা নিজেরাই ধান দেয়। তবে এ সংকট নিরসনে সীমিত পর্যায়ে চাল রপ্তানির চিন্তাভাবনা করছে সরকার।

উদ্বৃত্ত উত্পাদনের পরও চাল আমদানি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, চাল আমাদানি পুরোপুরি বন্ধ করা না হলেও নিরুত্সাহিত করতে প্রয়োজনে আমদানি শুল্ক আরো বাড়ানো হবে। অবশ্য তিনি বলেন, বাংলাদেশ বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কোনো কারণে ধান নষ্ট হলে খাদ্যঘাটতি হবে। তাই এ বিষয়টিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

এদিকে গত রবিবার চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেছেন, কৃষকদের ধানের নায্যমূল্য দিতে ব্যবসায়ীরা চাল রপ্তানির কথা বলেছে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরো আলাপ-আলোচনা দরকার।

ধান কিনছেন না মিলাররা: রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, ভরা মৌসুমেও রায়গঞ্জসহ আশেপাশের অধিকাংশ চালকলে উত্পাদন বন্ধ রয়েছে। চালকল মালিক ও ধান-চাল ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরের মতো বাজার থেকে আর ধান কিনছেন না। উপজেলার মেসার্স স্বচ্ছ চালকলের মালিক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, গত মৌসুমে চালের সরকারি সংগ্রহমূল্য ছিল প্রতি কেজি ৩৯ টাকা। এবার ৩৬ টাকা। প্রতি বছর ধানের উত্পাদন চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। তারপরও সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানি চালু রেখেছে। আমদানি করা চালের দরের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত চাল পাল্লা দিয়ে বাজারে ঢুকতে পারছে না। চাল বিক্রি না হলে আমরা ক্রসিং করে কী করবো? তাই ধান কেনায় থমকে গেছেন ব্যবসায়ীরা।

এলাকার বৃহত্ চালকল মেসার্স রোহান অটো রাইস মিলস এর মালিক আব্দুস সামাদ আকন্দ বলেন, তিনি চলতি সপ্তাহে অল্প পরিমাণ মিনিকেট ধান কিনেছেন। গত মৌসুমের ক্রসিং করা বিপুল পরিমাণ চাল তার মজুত রয়েছে। দাম এতকম যে লোকসান দিয়েও বিক্রি করতে পারছেন না। তাই ধান কিনছেন না।

চান্দাইকোনা বাজারের চাল ব্যবসায়ী সমর দত্ত চৌধুরী বলেন, ভারতীয় মিনিকেট, কাটারীভোগ আর বাসমতি চালে বাজার ছেয়ে গেছে। তার গুদামের স্থানীয় চালের গ্রাহক অর্ধেকে নেমে এসেছে। তাই তিনিও আর চাল কিনতে পারছেন না।

উপজেলার সিমলা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আব্দুস সাত্তার, চান্দাইকোনা গ্রামের জোতদার কামরুজ্জামান রাজু ও পার্শ্ববর্তী বগুড়া জেলার শেরপুরের কৃষক খোরশেদ আলম জানান, তারা এবার হিরা ধান ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, বিআর-২৮ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা এবং ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। যা গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কম। এই দরে ধান বিক্রি করে প্রতি মণ ধানে তাদের ২শ থেকে ৩শ টাকা লোকসান হচ্ছে।