বাঁচার তাগিদে জিরা চোরাচালানে নারী
মো. আমিরুজ্জামান, সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৪, ২৩:০১
সকাল সাড়ে ৮টা। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরসহ বৃহত্তর রংপুর বিভাগের শত শত নারী জড়ো হয়েছেন হিলি সীমান্ত এলাকায়। সীমান্তের এপার-ওপারে থাকা দালালদের ইঙ্গিত পেলেই তারা দলে দলে ঢুকে পড়বেন ভারতীয় এলাকায়। কিন্তু কখন যে ইঙ্গিত মিলবে কেউই জানেন না। শুধুমাত্র দালালের ইশারা পেলেই ওপারে ঢুকে জিরা কিনতে পারবেন এইসব নারী চোরাচালানীরা। কিন্তু শুধু টাকা দিয়ে দালালদের খুশি করা যায় না। কারো কাছ থেকে তারা টাকা নিয়ে খুশি। আবার কারো কাছে পেতে চায় ‘অবৈধ মেলামেশা’। এভাবেই এসব নারীদের অনেকেই বাঁচার তাগিদে নিজের সম্ভ্রম বিলীন করে দিয়ে জিরা চোরাচালান করছেন বছরের পর বছর। সম্প্রতি হিলি সীমান্তে সরেজমিনে গিয়ে এই ভয়াবহ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন হিলির ওপারে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় আসে হাজার হাজার মণ জিরা। মূলত পেটের দায়ে এই জিরা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েছেন নারীরা। দেখা গেছে, সীমান্তের একই এলাকায় শত শত নারী বসে আছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। প্রয়োজন মিটাতে সেখানে নেই কোন শৌচাগার বা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। তারপরেও নারী চোরাচালানীদের পদচারণায় মুখর গোটা এলাকা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যারা দালালদের খুশি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে নিজ নিজ এলাকায়। অনেক সময় জেল-জরিমানার শিকারও হচ্ছেন অনেক নারী। স্বাধীন দেশের নারীরা আজ বাঁচার তাগিদে নিজেকে বিলীন করছেন দালালদের কাছে। কিন্তু সেটা দেখার যেন কেউই নেই।
জিরা চোরাচালানে জড়িত বেশ ক’জন মধ্যবয়সী নারী জানান, ‘সাংবাদিক সাহেব কোন ভালো মানুষ এ ধরনের ব্যবসায় লিপ্ত হয় না এবং উচিতও না। সংসারে অভাব অনটনের কথা ভেবে সৈয়দপুর শহরের ক’জন ব্যবসায়ীর কাছে যাই। ব্যবসায়ীরা আমাদের কিছু টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে বলেন, এই টাকা দিয়ে হিলি থেকে জিরা আনলে বিনিময়ে দৈনিক ২ থেকে ৩শ’ টাকা পাওয়া যাবে। সংসারের কথা ভেবে রাজি হই। কিন্তু হিলি গিয়ে দেখি এটা একটা অন্য জগত। এ ব্যবসায় দৈনিক ২/৩ শ’ টাকা পাওয়া গেলেও হারাতে হয় নিজেকে। এছাড়া চোরাচালানীর বদনাম তো আছেই।’
রহিম নামের এক জিরা ব্যবসায়ী জানান, তিনি দীর্ঘ ২০ বছর থেকে একই ব্যবসা করে আসছেন। পুরুষরা দালালদের হাতে মোটা অংকের টাকা অথবা হাত-পা ধরে এ ব্যবসা করলেও নারীরা তা পারে না। এরপরেও নারীরা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েই বাঁচার তাগিদে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যেসব সুন্দরী নারী দালালদের অবৈধ দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়, তাদের কৌশলে ভারতীয় এলাকায় পাঠিয়ে দিয়ে সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। এরপর তাদের কপালে জোটে জেল-জরিমানা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিলি এলাকার বেশ ক’জন বাসিন্দা জানান, অভাবগ্রস্ত ওইসব নারীদের দেখে ভীষণ মায়া হয়। কারণ, এরা নিজেকে বিলীন করছেন বাঁচার তাগিদে। এরপরেও তাদের খেতাব দেয়া হচ্ছে চোরাচালানীর। জেল জরিমানাও হচ্ছে তাদের। কিন্তু যারা অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় মালামাল দেশে নিয়ে আসছে তাদের কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্ণধারসহ রাজনৈতিক নেতারা সম্মানের সাথে সালাম দিয়ে চলেছেন। যারা পেটের তাগিদে এ ব্যবসা করছেন শুধুমাত্র কি তারাই চোরাচালানী? তাদের জন্যই কি শুধু আইন? এ প্রশ্ন হিলির সর্বস্তরের মানুষের।