তবুও পিছিয়ে তারা
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৪, ১৯:৫৬
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে নারীরা আজ ঘরে-বাইরে সর্বত্র নিজেদেরকে কাজে নিয়োজিত রেখেছেন। নারীরা আজ বসে নেই। আমাদের দেশের ঘরের কাজগুলো মূলত নারীরা করে থাকলেও সেই কাজগুলোকে সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ধরা হয়ে থাকে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের একটি জরিপ থেকে দেখা যায়, পুরুষের তুলনায় নারীরা ১৫ গুণ সাংসারিক কাজ করে থাকে। পারিবারিক শ্রমের ৮০ শতাংশ কাজ করে থাকেন নারীরা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো নারীরা পরিবারের সদস্যদের দ্বারাই বেশি নির্যাতিত হয়!
আজ নারী শুধু ঘরেই কাজ করছে না। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারী বাড়িয়েছে তার কাজের পরিধি। প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বমোট কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৪১ লাখ। এর মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১ কোটি ৬২ লাখ। আর আইএলও-এর হিসাব অনুযায়ী দেশে কর্মরত মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশই নারী। আবার যে সব নারী শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারাও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। বৈদেশিক আয়ের ৭৫ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প থেকে। আর এই পোশাক শিল্পের মেরুদন্ড নারী শ্রমিকরা। পোশাক শিল্পের মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশই নারী।
আবার কৃষি বাংলাদেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই খাতেও নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। গ্রামীণ নারীদের ৭৫ শতাংশই সরাসরি কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। দেশের গ্রামগুলোতে ১০ হাজার নারী গ্রামীণফোনের মাধ্যমে ১ কোটিরও বেশি নারীকে সেবা দিচ্ছেন। আমাদের দেশের অর্থনীতির বড় একটি ভিত্তি হলো বিদেশি শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা। পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের চাহিদা রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ৫ শতাংশ নারী হলেও এই সংখ্যা বাড়ছে।
সার্ভিস খাতে ১২ শতাংশ এবং শিল্পখাতে নারীরা ১০ শতাংশ হারে অবদান রাখছেন। বাংলাদেশের একজন নারী গড়ে বছরে ৭০০ মার্কিন ডলার উপার্জন করেন। যা দেশের মাথাপিছু আয়ের থেকেও বেশি। এই অবস্থায়ও নারীরা আজ সর্বত্র নির্যাতিত হচ্ছে। সর্বোপরী নারী শ্রমিকদেরকেও পুরুষের তুলনায় কম সম্মানী দেয়া হয়। যা এক ধরনের বৈষম্য।
যে সমাজে নারী পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে সেখানে নারী-পুরুষের এই ধরনের বৈষম্য কোনমতেই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের নারী রাজনীতি, শিক্ষা, আইন, ব্যাংকিং, প্রতিরক্ষা, বিমান চালনা, ট্রেন চালনা, কর্পোরেট, সাহিত্য রচনা-সাংবাদিকতা, চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাণ, শিল্পকলাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে দেশকে একটি গতিশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করছেন। যেটা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সমাজ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের সমতার মাধ্যমে সবাই এক সঙ্গে কাজ না করলে দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। দীর্ঘদিন ধরে এদেশে নারীরা রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা দু’জনই নারী। বিশ্বের অন্য কোন দেশে এমনটি দেখা যায় না। এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে নারী স্পিকার পদে আসীন হয়ে সংসদ কার্য পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশের নারী আনসার, পুলিশসহ বর্তমানে সেনাবাহিনীতেও দক্ষতার সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। নারী বৈমানিকরা আকাশে উড়ছেন অনবরত। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের দু’জন তরুণীও এভারেস্ট জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এটা বাংলাদেশের নারীর একটি বড় অর্জন।
সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, বর্তমান সরকারের নারী মন্ত্রীরা খুব দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির হাত ধরেই বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র জয়ের অর্জন এসেছে। আর কৃষির যে সাফল্য তাও একজন নারী নেতৃত্বের অসাধারণ অর্জন। নারী মন্ত্রীরা অবৈধ পন্থায় অর্থ-সম্পদের মালিক হয়নি। ’৭১-এ কোন নারী রাজাকারের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। বরং তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে এবং আড়াই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়ে চরমভাবে অপমানিত হয়েছেন।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে নারী যদি পুরুষের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে কাজ করতে না পারে তাহলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। অথচ এদেশের জামায়াত ও হেফাজতীরা নারীর অগ্রযাত্রাকে রুখতে চায় পশ্চাত্পদ ধ্যান-ধারণা দিয়ে। এদেশে রাজাকাররা একাত্তরে নারীর সম্ভ্রমহানি করতে সহায়তা করেছে পাক-হানাদার বাহিনীকে। যারা দেশের অস্তিত্বকে অবমাননা করে সেই যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী দলটির ওপর ভর করেছে বিএনপি সংগঠনটি। যে দলের প্রধান একজন নারী। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগজনক। বিএনপিকে এই জামায়াত নির্ভর রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন এখন নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে হতে পারে। তাই দেশে নারী বৈষম্যের যে চিত্র তা তাড়াতাড়ি শুধরে নিতে হবে। নারী-পুরুষ সমতার ভিত্তিতে দেশ উন্নয়নের চরম শিখরে উঠবে, এটাই কাম্য।