জয় পেতে পারে তৃতীয় ফ্রন্ট!
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৪, ২২:৩৩
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ১১টি রাজনৈতিক দল মিলে তৃতীয় ফ্রন্ট (থার্ড ফ্রন্ট) গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী এপ্রিলে শুরু হতে যাওয়া এই নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘোষণা আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ ভারতের বৃহত্ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বর্তমান অবস্থায় তৃতীয় ফ্রন্ট হয়তো তাদের জয় ছিনিয়েও আনতে পারে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাতটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও চারটি বামপন্থী দল মিলে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, তৃতীয় ফ্রন্টই ভারতের প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এবং বিজেপির বিকল্প হতে পারে। ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের ভরাডুবি হতে যাচ্ছে। আর বিরোধীদল বিজেপি আগ্রাসী পুঁজিবাদ ও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শে পরিচালিত বলে তারা মনে করে।
গত অক্টোবরে মুজাফফরনগরে দাঙ্গার পর ১৪টি রাজনৈতিক দল একসঙ্গে মিলে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সভা করে। তখন থেকেই একটি বিকল্প রাজনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। গত মাসে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার কংগ্রেস-বিজেপিবিহীন ফ্রন্টের সমাবেশে যোগদানের জন্য দিল্লি গেলে সে সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। এর আগেও একবার কংগ্রেস-বিজেপি বিহীন জোট ভারতের জাতীয় পর্যায়ে সফলতার মুখ দেখেছিলো। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে জনতা দলকে ভোট দিয়েছিলো ভারতের জনগণ।
সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টারের এ জরিপের ফলে দেখা যায়, ভারতের ৬৩ শতাংশ মানুষ মনে করে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীরই আগামী সরকারের নেতৃত্ব দেয়া উচিত। তবে ভারতের নির্বাচন নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা সব সময়ই কঠিন। কারণ ২০০৪ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়ী হওয়া ছিলো ধাক্কা লাগার মতো ঘটনা। সাম্প্রতিকালে দিল্লির বিধান সভার নির্বাচনে দুর্নীতি বিরোধী রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টির (এএপি) উত্থানও ছিলো বড় দুই রাজনৈতিক দলের জন্য হতাশাজনক ঘটনা। এই এএপি দিল্লির মতোই অনেক শহুরে এলাকায় চমক দেখাতে পারে। যে কারণে জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মোদী এবারের নির্বাচনে ফেভারিট হলেও বিজেপিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকার গঠন করতে হলে বিজেপিকে সবচেয়ে বেশি আসনে জিততে হবে। এরপরই তারা ছোট রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে জোট করতে পারবে। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মতে, এজন্য বিজেপিকে ১৮০ থেকে ২২০টি আসন পেতে হবে। যদিও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে বিজেপি সর্বোচ্চ ১৮২টি আসনে জিতেছিলো।
১৯৮৯ সাল থেকেই ভারতে জোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এবারের নির্বাচনেও ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে তা অনেকটাই নিশ্চিত। কারণ কোনো বড় দলের এককভাবে ২৭২ আসনে জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে লোকসভায় তৃতীয় ফ্রন্টে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর আসন সংখ্যা ৯২টি। কংগ্রেসের ভোটও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিজেপি জোটের শরিকদের সহযোগিতা পেতে ব্যর্থ হলে ঐ তৃতীয় ফ্রন্টই জয় ছিনিয়ে নিতে পারে।
ভারতে জোট গঠন সব সময় রাজনৈতিক সুবিধার উপর নির্ভর করে। কিন্তু নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এ ধরনের তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা অনেকটাই দুঃসাহসিক বিষয়। এর মাধ্যমে একটি ইঙ্গিত স্পষ্ট যে, এসব দলের নেতাদের ফ্রন্টের সম্ভাবনার উপর আস্থা রয়েছে। এখন তারা আরো শরিক খুঁজছেন। সম্প্রতি নিতীশ কুমার বলেছেন, পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব নেই অথচ এর বাইরে দলের শক্তি রয়েছে তারাও এই নতুন ব্লকে যোগ দিতে পারে।
ভারতের কিছু আঞ্চলিক বড় নেতার সমন্বয়ে এই তৃতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। যেখানে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার ছাড়াও আছেন তামিল নাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা, ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী নভীন পাটনায়েক ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেব গৌড়া। এসব রাজনীতিক তাদের অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও সমগ্র ভারতজুড়ে তাদের প্রভাবের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট। তাদের সকলের সম্মিলিত ভোট জাতীয় পর্যায়ে সফলতার জন্য পর্যাপ্ত কিনা সে বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই সব মিলিয়ে তৃতীয় ফ্রন্টের ভাল-মন্দ উভয় সম্ভাবনা রয়েছে বলা যায়। দুর্নীতি দমন ও অসাম্প্রদায়িকতাকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়ার দুটি লক্ষ্য নিয়ে ১১ পার্টির এই জোট গঠিত হয়েছে। তবে এই ফ্রন্টের শক্ত কোনো আদর্শ ও গতিশীল নেতৃত্ব নেই।
এখন পর্যন্ত তৃতীয় ফ্রন্ট থেকে কে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এটা নির্বাচনে ভোটের আগে এক ধরনের চতুরতা বলা চলে। কিন্তু নির্বাচনে যদি তৃতীয় ফ্রন্ট ভালো করে সেক্ষেত্রে তাদের কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন দেখা দেবে। কারণ নির্বাচনের পর এক রাজ্যের ভোটাররা অন্য রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীকে নাও মানতে পারে।
এখন পর্যন্ত ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্যে কংগ্রেস-বিজেপির শাসন রয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা বলা যায়, পরীক্ষার পূর্ব প্রস্তুতি। বর্তমানে বিজেপি আর এএপি গণমাধ্যমের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। তৃতীয় ফ্রন্ট তাদের এ ঘোষণার মাধ্যমে দলের অবস্থা ভালো ও ক্যাডারদের চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জোটের হিসাব-নিকাশ যাই হোক না কেন ভারতে সরকার গঠনে আঞ্চলিক দলগুলোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই জোট রাজনীতির যুগে পার্লামেন্টে ১০ থেকে ২০টি আসন পাওয়া দলও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় যথেষ্ট।
বর্তমানে ভারতের লোকসভায় ৩৮টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি দলের ১০ থেকে ২০ করে আসন রয়েছে। তারাই কেন্দ্রীয় সরকারকে আকৃতি দেয়। এবারের সরকারের বৈশিষ্ট্য কী হবে তা শিগগিরই নির্ধারিত হয়ে যাবে।
টোকিওভিত্তিক সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর অনলাইন সাময়িকী দ্য ডিপ্লোমেট-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধ অবলম্বনে।