চুয়েটের চার উদ্ভাবন
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৪, ১৮:১৯
আমাদের দেশ দুর্যোগপ্রবণ। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা একের পর এক উদ্ভাবন করে চলেছে। চুয়েট উদ্ভাবনে পিছিয়ে নেই। চুয়েটের চার উদ্ভাবন নিয়ে আমাদের আয়োজন। জানাচ্ছেন—
বারেক কায়সার
ট্রেনের সংঘর্ষ এড়ানো যাবে
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খিজির মাহমুদ ও মোঃ রিয়া সাদ আজিম ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়ানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। তত্ত্বাবধানে ছিলেন তড়িত্ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছোটন কান্তি দাশ। প্রযুক্তিটির মাধ্যমে দুটি ট্রেনের অবস্থান নির্ণয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন দুটিকে মুখোমুখি সংঘর্ষের হাত থেকে রক্ষা করবে। ট্রেন লাইনে ট্রেনের অবস্থান নির্ণায়ক কিছু সেন্সর লাগানো থাকবে যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে ট্রেনের অবস্থান ও গতির দিক প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি কোনো ট্রেন ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশনা কিংবা অসাবধানতাবশত মুখোমুখি অবস্থানে আসার উপক্রম হয় তাহলে প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষে এটির জন্য অ্যালার্ম বেজে উঠবে, ট্রেনের অবস্থান নির্দেশ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেবে। তারপরও যদি কোন ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে ট্রেন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষের আগেই যে কোন একটি ট্রেনের লাইন পরিবর্তন করে দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন দুটিকে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করবে। এজন্য প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কম্পিউটারে উদ্ভাবকদের উদ্ভাবিত একটি সফটওয়্যার থাকবে যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসেও ট্রেনের লাইন পরিবর্তন করা যাবে। এছাড়াও সফটওয়্যারটির মাধ্যমে প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসেও ট্রেনের অবস্থান ও গতির দিক সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
ঘরে বসেই মিলবে বাসের টিকেট
বাসের মোবাইল টিকেটিংয়ের কৌশল উদ্ভাবন করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবক দল ম্যাভারিক। দলের সদস্যরা হলেন- হাসানুজ্জামান নূর, ফাহিম মাসুদ চৌধুরী ও সাফায়েত আরেফিন। ম্যাভেরিক দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে সহজেই যেকোনো গন্তব্যের জন্য বাসের টিকেট বুকিং করা যাবে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে। এ ক্ষেত্রে টিকেটের জন্য কাউন্টারে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে না। কেবল মোবাইলের কি চেপে নিমেষেই কেটে নেয়া যাবে যেকোনো গন্তব্যের টিকিট। এছাড়া গ্রাহকরা নিজের মোবাইলেই জানতে পারবেন বিভিন্ন বাসের সময়সূচি, কোথায় কোন বাসের কোন আসন খালি, কোন গন্তব্যের ভাড়া কত ইত্যাদি যাবতীয় সব তথ্য। এজন্য কোনো খুদে বার্তা পাঠানোরও প্রয়োজন হবে না। সরাসরি অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহারের মাধ্যমেই গ্রাহকরা এসব সেবা পাবেন। অ্যাপ্লিকেশনটি চালু করে চাহিদা অনুযায়ী টিকেট বুকিং দিলে গ্রাহকদের একটি ইলেকট্রনিক টিকিট নম্বর দেয়া হবে। এই নম্বর দিয়ে তিনি যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ আগে কাউন্টার থেকে কাগজের টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে টিকেটের মূল্য পরিশোধের জন্য কোনো ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হবে না।
সৌরশক্তি দিয়ে চলবে রেফ্রিজারেটর
সৌরশক্তিচালিত রেফ্রিজারেটর উদ্ভাবন করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো.সোহেল রানা। প্রকল্পের নাম ‘ডিজাইন অ্যান্ড ফেব্রিকেশন অব সোলার অ্যাবজরশন রেফ্রিজারেটর’। সৌরশক্তিচালিত এই রেফ্রিজারেটর রাতেও চলবে। দিনে জমানো শক্তি দিয়ে রাতে চলবে এ যন্ত্র। জানা যায়, এটি তৈরি করতে সোলার রিফ্লেক্টর, শীতক, ইভাপুরেটর, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। সোলার রিফ্লেক্টরের ওপর সূর্যালোক পড়লে তা এর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে জেনারেটর পাইপকে উত্তপ্ত করে, যা জেনারেটর পাইপের মধ্যে থাকা ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ও অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইডের মিশ্রণকে উত্তপ্ত করবে, যা অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে অ্যামোনিয়ায় রূপান্তর করবে। এ অ্যামোনিয়া বাষ্প চিকন পাইপ দিয়ে শীতকে (কনডেনসার) যাবে এবং সেখানে গিয়ে তাপ ছেড়ে দিয়ে তরল হবে। এ তরল অ্যামোনিয়া ইভাপুরেটরের স্টোরে জমা হবে। অ্যামোনিয়া কম তাপমাত্রায় বাষ্পায়িত হয়। এ কারণে ইভাপুরেটরের আশপাশে যে জিনিস রাখা হয়, তা থেকে তরল অ্যামোনিয়া তাপ গ্রহণ করে বাষ্পীভূত হয়ে পুনরায় জেনারেটর পাইপে ফিরে আসবে এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড অ্যামোনিয়াকে পুনরায় শোষণ করবে। এভাবে প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে রেফ্রিজারেটর চলবে।
সহায়তা করবে রেসকিউ রোবট
অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী উদ্ভাবন করেছে উদ্ধারকারী রোবট বা রেসকিউ রোবট। উদ্ভাবনকারী দলের সদস্যরা হলেন- এমটিআর আজাদ পোদ্দার, দিব্য জ্যোতি ফৌজদার, ইনসান আরাফাত জামিল, কাদের ও শাহরিয়ার। যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দুর্গত মানুষদের উদ্ধার ও সাহায্য করার জন্য এ রোবট কাজ করবে। গবেষকরা বলেন, উদ্ধারকারী সিরিজ রোবটের আওতায় সর্বপ্রথম যে রোবটটি তৈরি করা হয়েছে তা অগ্নিকাণ্ড থেকে দুর্গতদের উদ্ধারে ব্যবহার করা যাবে। প্রাথমিকভাবে রোবটটিকে লাইন ফলোয়ার হিসেবে কাজ করানো হয়েছে। এ রোবটটি গৃহে আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করবে, এ্যালার্ম দেবে এবং উদ্ধার কাজ শুরু করবে। জানা গেছে, রেসকিউ সিরিজ রোবটের আওতায় আরও কয়েক ধরনের উদ্ধারকারী রোবট রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ভূমিকম্প উদ্ধারকারী রোবট, উভচর রোবট ইত্যাদি।
মডেলঃ সজীব, শারলিন, হিমু
ছবিঃ শারহাত তুরিন