কারখানা বন্ধ করার মত ত্রুটি পায়নি ইউরোপীয় অ্যাকর্ড

বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টি কারখানায় বেশকিছু ত্রুটি চিহ্নিত করেছে ইউরোপীয় ক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শক দল অ্যাকর্ড। এর মধ্যে একটি কারখানার প্রতিটি ফ্লোরকে দ্রুত অতিরিক্ত ভারমুক্ত করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভবনের কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি পাওয়া গেছে এমন কারখানাকে আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ত্রুটি সারানোর জন্য বলা হয়েছে। তবে এখনই কোন কারখানার কাজ বন্ধ করে দেয়ার মত বড় ধরনের ত্রুটি পাওয়া যায় নি। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে পরিদর্শন হওয়া প্রতিটি কারখানার নিরাপত্তা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয় অ্যাকর্ডের পক্ষ থেকে। অ্যাকর্ড অন ফায়ার এন্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ-এর প্রধান নিরাপত্তা পরিদর্শক ব্রাড লোয়েন কারখানা পরিদর্শনের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় বাংলাদেশে অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েজ ও অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটির বাংলাদেশি সদস্য শ্রমিক নেতা রায় রমেশ চন্দ্র উপস্থিত ছিলেন। এর আগে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্সও ২২২টি কারখানা পরিদর্শনের বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেছে। ওই ২২২টি কারখানায়ও বড় ধরনের কোন ত্রুটি পাওয়া যায়নি বলে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এদিকে অ্যাকর্ড ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের পরিদর্শক জোট অ্যালায়েন্স কারখানা পরীক্ষার নামে নতুন নতুন নিরাপত্তা শর্ত জুড়ে দিয়ে গার্মেন্টস খাতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মালিক পক্ষ। গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও বিদেশিদের বিরুদ্ধে এই খাত নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে শ্রমিকের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কারখানার নিরাপত্তা রক্ষাই অ্যাকর্ডের মূল উদ্দেশ্য বলে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের সমস্যা সমাধানে বেশি মনোযোগী হওয়ার জন্য কারখানা মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, অ্যাকর্ড যেহেতু বিদেশি ক্রেতাদের পরিদর্শন জোট সে জন্য তাদের সঙ্গে বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়া ঠিক হবে না। তাতে উল্টো ক্রেতা হারানোর আশংকা রয়েছে। আমাদের দুর্বলতা কাটানোর জন্য তারা (অ্যাকর্ড) যে সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছে সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। এদিকে সমপ্রতি বিজিএমইএতে এক অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, এ খাত এখন সত্যিই হুমকির মুখে। পরিদর্শন চলাকালীন কারখানার অর্ডার প্রত্যাহার করা হবে না বলে ইউরোপের ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু অনেক কারখানার অর্ডার ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে তারা। এছাড়া শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর পর গার্মেন্টস পণ্যের দাম বাড়ানো হবে বলা হলেও কার্যত দাম বাড়ায় নি। তিনি বলেন, রাতারাতি কারখানায় পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ জন্য দুই বছর সময় দিতে হবে। অ্যাকর্ডের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ৭৮টি কারখানা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১০টি কারখানা পরিদর্শনের প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। বাকি কারখানার পরিদর্শন প্রতিবেদন পরবর্তীতে তুলে ধরা হবে। এছাড়া আরো প্রায় ১ হাজার ৭০০টি কারখানা আগামী ৫ মাসের মধ্যে পরিদর্শন সম্পন্ন করতে চায় অ্যাকর্ড। এর বাইরে অ্যালায়েন্স আরো প্রায় ৮০০ কারখানা পরিদর্শন কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু করেছে। অ্যাকর্ডের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস মালিক ও সরকারের বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেয়া হয়। রব ওয়েজ বলেন, কোন ষড়যন্ত্র নয়। কারখানা পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রমিকের নিরাপত্তা। এক্ষেত্রে তাদের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিদর্শন দলে সরকার, অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স, কারখানা মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি রয়েছে। কোন কারখানার বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর কারখানা পরীক্ষার পুরো কার্যক্রম বিজ্ঞানভিত্তিক। এছাড়া অতি ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা ভবন থেকে কারখানা সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মজুরিসহ অন্যান্য পাওনাদি মালিককে বহন করতে হবে বলে জানানো হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে কারখানার কাঠামোগত উন্নয়নে অ্যাকর্ডের পক্ষ থেকে কী উপায়ে সহায়তা করা যেতে পারে তা কারখানা মালিক ও ব্র্যান্ড (ক্রেতা) আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও এ সময় জানানো হয়। প্রাথমিকপর্যায়ে যে ১০টি কারখানা পরিদর্শন করা হয় এগুলো ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার। আলিফ গার্মেন্টস, আনলিমা টেক্সটাইল, বিগ বস কর্পোরেশন, ড্রাগন সোয়েটার, গ্রামীণ নিটওয়্যার, মজুমদার ফ্যাশন, রেডিয়েন্ট জ্যাকেট, রিও ফ্যাশনওয়্যার, দ্য ফ্যাশন আইল্যান্ড ও ভিয়েলাটেক্স। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিটি কারখানার পরিদর্শনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সব কারখানাতে ভবনের কাঠামো ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কমবেশি ত্রুটি রয়েছে। কোন কোন কারখানা ভবনের ড্রয়িংয়ের সাথে নির্মিত ভবনের অমিল, ভবনের বিমে ফাটল, ভবনের ফ্লোরের ক্ষমতার অতিরিক্ত ভারযুক্ত পণ্য ও মেশিন রাখাসহ বেশকিছু কাঠামোগত ত্রুটি পাওয়া গেছে। এছাড়া অনিরাপদ বৈদ্যুতিক ক্যাবল লাইন সঞ্চালন, বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ লাইনসহ বেশ কয়েকটি ত্রুটি বের করা হয়। এসব ত্রুটি সারানোর জন্য কারখানা মালিককে ৩ থেকে ৬ মাস সময় দেয়া হয়েছে। এই দশটিসহ এখন পর্যন্ত ৭৮টি কারখানা পরিদর্শন করেছে অ্যাকর্ড। তবে বাকি কারখানা পরিদর্শনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে সমপ্রতি পরিদর্শন হওয়া ওই সব কারখানার মধ্যে দুটি কারখানায় বড় ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মিরপুরের পল্লবীতে একটি কারখানায় কাজ বন্ধ করে দিয়েছে মালিক পক্ষ। এসব কারখানায় শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতির সুবিধা দেয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ওই কারখানার প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক বিক্ষোভ করেছে। কারখানা মালিকদের অভিযোগ, একের পর এক এভাবে কারখানা বন্ধ করে দিতে হলে শ্রমিকরা কর্ম হারাবে। ফলে বড় ধরনের শ্রম অসন্তোষের আশংকা রয়েছে। অ্যাকর্ডের একমাত্র বাংলাদেশি সদস্য রায় রমেশ চন্দ্র মনে করেন, পরিদর্শন নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এতে বরং বাংলাদেশেরই লাভ। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ এর বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব এই শ্রমিক নেতা ইত্তেফাককে বলেন, কারখানা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্যই হলো টেকসই ও নিরাপদ গার্মেন্টস শিল্প গড়ে তোলা। কঠিন হলেও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে গার্মেন্টস উদ্যোক্তাদের দূরদর্শী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মালিকপক্ষের উচিত হবে এ সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।’ তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিকের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশি গার্মেন্টস কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয় ইউরোপের ক্রেতারা। একই মান বজায় রাখার লক্ষ্যে ১৫০টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে অ্যাকর্ড অন ফায়ার এন্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে তারা। এর বাইরে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের সমন্বয়ে অ্যালায়েন্স নামে কারখানা পরিদর্শনে আলাদা একটি জোটও কাজ করছে। পরিদর্শনে ত্রুটি পাওয়া গেলে কারখানার কমপ্লায়েন্ট মানে (কর্মপরিবেশ) উন্নীত হতে ক্রেতাদের পক্ষ থেকে কারখানা মালিকদের সহায়তা করারও প্রতিশ্রুতি রয়েছে তাদের।