সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৪, ২৩:০২
‘মাননীয় স্পিকার, যিনি প্রশ্নকারী তিনিও নেই। যিনি উত্তরদাতা তিনিও নেই। যেই মন্ত্রী নেই, তার পক্ষে অন্য যে মন্ত্রী উত্তর দেয়ার কথা, তিনিও নেই। এ অবস্থায় আমি কী করি।’
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে কিছুটা অভিযোগের সুরে কথাগুলো বলছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তারকা চিহ্নিত ৯৯৯ নম্বর প্রশ্নটি ছিল চট্টগ্রাম-৪ আসনের আওয়ামী লীগের দিদারুল আলমের। সীতাকুণ্ড উপকূলীয় এলাকায় নতুন সাইক্লোন কেন্দ নির্মাণ সংক্রান্ত প্রশ্নটি ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার কাছে। মায়া উপস্থিত ছিলেন না। প্রশ্নকারী দিদারুল আলমও ছিলেন অনুপস্থিত। দিদারুলের পক্ষে প্রশ্নটি উত্থাপনের জন্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ফ্লোর দেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের এম. আব্দুল লতিফকে। প্রশ্নটি উত্থাপনের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর পক্ষে উত্তর দেয়ার জন্য স্পিকার আহ্বান জানান তোফায়েল আহমেদকে। এসময় স্পিকার বলেন ‘মাননীয় মন্ত্রী, আপনার নিজেরও আজ তিনটি প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলো একটু পরেই আসছে। এখন আপনি মাননীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর পক্ষে জবাব দেবেন।’ এসময় বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে স্পিকার বলেন ‘মাননীয় মন্ত্রী, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর পক্ষে উত্তরদানের জন্য অপ্রস্তুত থাকা বাণিজ্যমন্ত্রী মাইক পেয়ে শুরুতেই বলেন ‘কোন মন্ত্রীর পক্ষে অন্য কোন মন্ত্রী উত্তর দেবেন, তা নির্ধারিত রয়েছে। এ ব্যাপারে গেজেটও আছে। ত্রাণমন্ত্রীর পক্ষে উত্তর দেয়ার কথা কামরুল ইসলামের (খাদ্যমন্ত্রী)। কিন্তু তিনিও নেই। প্রশ্নকারী দিদারুল আলমও নেই। সকালে একটি অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে ত্রাণমন্ত্রীও ছিলেন, এখন দেখছি না। যাই হোক, আমার যে সীমিত জ্ঞান, সেটুকু দিয়ে আমি চেষ্টা করবো উত্তর দেয়ার।’ তার এই বক্তব্যের জবাবে স্পিকার আবারও বলেন ‘মাননীয় মন্ত্রী, আমি আগেই বলেছি-সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
চলতি সংসদের চলমান প্রথম অধিবেশনে প্রশ্নকারী ও উত্তরদাতা অনুপস্থিত থাকার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। প্রায় প্রতিদিনই বেশিরভাগ প্রশ্নকারী সংসদ সদস্যই অনুপস্থিত থাকছেন। মাঝে-মধ্যে নির্ধারিত উত্তরদাতা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও উপস্থিত থাকছেন না। এর আগেও একদিন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলীর পক্ষে তার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আরেকদিন বাণিজ্যমন্ত্রী জবাব দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের পক্ষে। আর তারকা চিহ্নিত প্রশ্নকারী নির্ধারিত সদস্যের অনুপস্থিত থাকা এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। বলতে গেলে, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী অধিবেশনের প্রথম পর্ব, অর্থাত্ প্রশ্নোত্তর পর্বটি চলছে এক ধরনের জোড়া-তালি দিয়ে।
গতকালও সংসদে পাঁচটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল। এর মধ্যে নির্ধারিত প্রশ্নকারীদের তিনজন ছিলেন অনুপস্থিত। তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন শুরু হয়েছিল ৯৯৬ নম্বর দিয়ে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে প্রশ্নটি ছিল নওগাঁ-৩ আসনের মো. ছলিম উদ্দীন তরফদারের। তার পক্ষে প্রশ্নটি উত্থাপন করেন রাজশাহী-৪ আসনের এনামুল হক। একই মন্ত্রীর কাছে ৯৯৮ নম্বর প্রশ্নটি ছিল সুনামগঞ্জ-১ আসনের মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের। তিনি অনুপস্থিত থাকায় তার পক্ষে প্রশ্নটি উত্থাপন করেন হবিগঞ্জ-১ আসনের আব্দুল মুনীম চৌধুরী। একইভাবে ৯৯৯ নম্বর প্রশ্নকারী দিদারুল আলমও ছিলেন না যেটির উত্তর দিতে গিয়ে তোফায়েল আহমেদ ওই কথাগুলো বলেছিলেন।
গত ২৯ জানুয়ারি চলতি অধিবেশন শুরুর কয়েকদিন পর থেকেই এমপিদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। আওয়ামী লীগের কয়েকজন এমপি ইত্তেফাককে জানান, উপজেলা নির্বাচন উপলক্ষে অনেক এমপি বর্তমানে নিজ এলাকায় অবস্থান করায় তারা সংসদে অনুপস্থিত থাকছেন। এমপিদের অনুপস্থিতির কারণে দু’একদিন পরপরই নির্ধারিত সময়ে সংসদের অধিবেশন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। মাগরিবের বিরতির পরও সংসদের অধিবেশন বসতে দেরি হয়।
গতকাল অধিবেশন শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল বিকাল ৫টায়। ঘড়ির কাঁটায় যখন ৫টা, নিয়ম অনুযায়ী তখন শুরু হয় ঘণ্টা বাজানো। কিন্তু সংসদের কোরাম পূর্ণ হচ্ছিল না। দফায়-দফায় বাজানো হয় ঘণ্টা। সংসদ সদস্যদের খুঁজে-খুঁজে অধিবেশন কক্ষে আনতে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন চিফ হুইপ আ.স.ম ফিরোজ। কোনোভাবে কোরাম পূর্ণ হওয়ায় অধিবেশন শুরু হয় ৫টা ২১ মিনিটে। স্পিকারের আসন গ্রহণ করেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তখন স্পিকারের ডানদিকে ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন শুধু সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
অধিবেশন কক্ষের মধ্যভাগসহ ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারির বাকি সব আসনই ছিল ফাঁকা। আর বিরোধী দলের প্রথম সারিতে ছিলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু। প্রথম সারিতে জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও উপস্থিত ছিলেন। ট্রেজারি বেঞ্চের দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন কেবল চিফ হুইপ আ.স.ম ফিরোজ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। অবশিষ্ট সব আসন ছিল ফাঁকা।
চলতি দশম সংসদে বর্তমান ২৯৭ জন্য সংসদ সদস্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩২, জাতীয় পার্টির (জাপা) ৩৪, জাতীয় পার্টির (জেপি) ২, ওয়ার্কার্স পার্টির ৬, জাসদের ৫, তরিকত ফেডারেশনের ২, বিএনএফের ১ জন সদস্য রয়েছেন। স্বতন্ত্র সদস্য আছেন ১৬ জন।