৮০ ভাগ রোগীই জানে না তাদের কিডনি সমস্যা

৮০ ভাগ রোগীই জানেন না তিনি কিডনি সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আর যখন জানতে পারেন, তখন আর করার তেমন কিছু থাকে না। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯০ ভাগই চিকিত্সা সেবার বাইরে থাকছেন। বাকী যে ১০ ভাগ রোগী চিকিত্সা সেবা নেন, তাদের সবাই পুরো চিকিত্সা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন না। কিডনি রোগের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক রোগীই চিকিত্সা প্রক্রিয়ার মাঝপথে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। এ উপলক্ষে দেশের খ্যাতমান কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা এসব তথ্য জানান। এবারের কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘বার্ধক্যে কিডনির কর্মক্ষমতা কমে।’ দিবসটি পালনে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন, কিডনি ফাউন্ডেশন, কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটি, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, অ্যাপোলো হাসপাতাল, ইনসাফ বারাকাহ কিডনি ও জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন সংগঠন শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কিডনি দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। তিনি তার বাণীতে বলেন, আকস্মিক কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও বয়স্কদের কিডনি রোগের চিকিত্সায় সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনসহ সকল প্রতিষ্ঠান জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিডনি রোগ প্রতিরোধে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল আলম জানান, ২০০৮ ও ২০১০ সালে সাভারের চাকলিয়া গ্রামে এক জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের ১৮ ভাগ লোক কোন না কোন কিডনি সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত। দেশের ১৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। আক্রান্তদের ৯০ ভাগ থাকছেন চিকিত্সা সেবার বাইরে। মাত্র ১০ ভাগ চিকিত্সার জন্য হাসপাতাল কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের কাছে যান। যারা হাসপাতালে যাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই ৫ থেকে ৬ মাস চিকিত্সা নিয়ে পরে তা বন্ধ করে দেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, রোগীদের পক্ষে এই ব্যয়বহুল চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় না। অল্পকিছু মানুষ পুরো চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করেন। সাভার চাকলিয়া গ্রামটিকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ধরে এবং বিভিন্ন হাসপাতালে রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের জরিপে কিডনি রোগের এই ভয়াবহ তথ্য-প্রমাণ মেলে। এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এই তিন কারণে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগীর ধীরে ধীরে কিডনি বিকল বা ক্রনিক কিডনি ডিজিস হয়ে থাকে। ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রক্ত চাপ কমা, খোস পাঁচড়া, অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশন, অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ ও এন্টিবায়েটিক সেবনে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। বর্তমান বিশ্বে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে একজন রোগী ৫ থেকে ১৫ বছর এবং সফল কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত স্বভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। মানুষের কিডনি প্রতি ১০ বছরে ১০ ভাগ করে ক্ষমতা হারায়। বার্ধক্যে গ্রহণ করা ওষুধ সহজেই কিডনিকে আক্রান্ত করে এর কর্মক্ষমতা নষ্ট করে। এজন্য অনেক সময় শরীরে অতিরিক্ত পানি জমতে পারে, লবণ স্বল্পতা দেখা দেয় এবং রক্তে পটাসিয়ামের মাত্রা বাড়তে পারে। ডায়রিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণেও কিডনি সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। ব্যথানাশক ও এন্টিবায়োটিক সেবনে অতিরিক্ত সতর্কতা থাকা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। যাদের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও ধূমপানের অভ্যাস রয়েছে এবং যাদের পরিবারে এসকল রোগ-ভোগের ইতিহাস রয়েছে তাদের কিডনি সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। কিডনির যত্ন ও সুস্থ থাকার জন্য বার্ধক্যে সচেতনতার পাশাপাশি চিকিত্সকদের নিয়মিত পরামর্শ নিতে হবে। দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের জন্য রয়েছে ১০০ জন কিডনি বিশেষজ্ঞ এবং ২০ জন ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন। এই রোগে যত ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের চিকিত্সার জন্য সরকারি চিকিত্সা ব্যবস্থা সীমিত। যতটুকু আছে, তাও রাজধানীতে। যার ফলে সারাদেশের কিডনি রোগীরা চিকিত্সার জন্য রাজধানীতে এসে অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। রাজধানীর বাইরে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাপাতালগুলোতে কিডনি ইউনিট চালু হলেও যন্ত্রপাতি ও জনবলের সংকট রয়েছে। রেনাল অ্যাসোসিয়েশন বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক প্রেস-ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা কিডনি রোগ প্রতিকার, সচেতনতা ও চিকিত্সা ব্যবস্থার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম, সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. ফিরোজ খান, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মুহিবুর রহমান প্রমুখ।