নদীতে লাশেরা ভেসে যাচ্ছে
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৪, ১৭:৫৪
‘কলার গাছ তিনটা। কারো কলাবাগান থেকে উপড়ে চলে এসেছে নাকি বান এলো কোনো দেশে?’
কারেন্ট জাল গোটানো প্রায় শেষ, চোখের নিচে কুচিমুচি ভাঁজ তুলে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে দেখবার চেষ্টা করতে করতে বলে মন্টু সাকিদার। তীরে জানু পেতে আনমনে কাদা ছানছে তার ব্যাটা রতন। বাপের কথায় উত্সুক হলো, তিনটা আর দুইটা জোড়া দিলে তার অনুপাতে জব্বর একটা ভেলা, প্রাণ নেচে ওঠে। সেনোয়া ব্রিজের নিচ দিয়ে স্পার ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে ওগুলো।
বাপ কলার গাছ বললেও কেমন কেমন ঠ্যাকে, সতেজ সকালে কিশোরের নবীন চোখ যা দেখতে পাচ্ছে, মন তা বিশ্বাসে বিরোধিতা করছে। শরীরকে আরাম দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বইছে। নিত্য দিনকার মতোই ট্যাংগন নদীতে জোর স্রোত।
বস্তুগুলোর সাথে ওদের দূরত্ব ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে দেখার নাগালের মধ্যে চলে আসলে মন্টু সাকিদারের নতুন পাতলা ছানিটা যেন আরো এক পরত পুরু হতে চাইল পুরাতন ঘোলা আয়নার মতো। কিন্তু রতনের হলো না, সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, এবার সাকিদার ভয়ে কাটা মাছের মতো পানি থেকে ডাঙায় ঝাঁপ দিল, তার ভয় সংক্রম হয়েছে ব্যাটায়। দুজনে শিউরে উঠে প্রায় শ্বাস বন্ধ করে ফেলল তিনটে কলার গাছ দেখে নয়, তিনটে মরা মানুষ দেখে।
মধ্যবয়সী পুরুষটা চিত্ হয়ে ভেসে যাচ্ছে, মেয়েটির গোছ গোছ কালো চুল কী সুন্দর পানির গায়ে বাদলা মেঘের মতো খেলা করতে করতে চলেছে, আর ছোট ছেলেটা, বয়স দশ কি এগারো হবে, রতন কেমন বিস্মিত আর আবেগপূর্ণ হয়ে যায়। ছেলেটার পেটটা ফুলো, এই বুঝি চুপসে যাবে বেলুন পেট ভুউউস করে, তারপর চোখ মেলে উঠে বসবে পানির ওপর, পেটের পানি পিচকারির মতো আকাশের দিকে ছেড়ে রতনকে বোকা বানানোর আনন্দে হাসতে হাসতে জুড়ে দেবে পেঁপে চুরির কাহিনি।
ঘুমভাঙা চোখ ডলে নিয়ে বলতে শুরু করবে চৌধুরীদের নতুন পেঁপে বাগানে ঢুকে কচি কুসী ছিঁড়েছিল নাকি তার মায়ের হাড়গিলে দুধেল গাইটা ইচ্ছে করে ছেড়ে দিয়েছিল চৌধুরীর সবুজ বিছন ক্ষেতে নাকি চৌধুরীর নতুন বীজতলায় ওদের হাঁসের পাল ঢুকে নরম কাদায় ব্যাপক লটরপটর করেছিল!
নরম মাটিতে হুড়মুড় করে বেড়ে ওঠা তাজা ধানচারা খেয়ে যদি গাইয়ের তলপেটের বিঘত খাইটা একটু পুরু হয়! গাইয়ের বিছন চিবানোর ঘষর ঘষর শব্দে ছেলেটিরও পেট ভরে বুঝি টনটনে হয়ে উঠছিল গো! বারবার ঢোক গিলতে গিলতে সেও ওই বিছন চিবিয়ে যাচ্ছিল যেনবা, না হলে তার ঠোঁটের কষে ওই সবুজ ও কী? শ্যাওলা না ধানের চারা না বাচ্চা পেঁপের পেলব ছাল?
‘টিয়াসবুজ কচি পেঁপে আঁচড় দিলে দরদরিয়ে দুধ বেরিয়ে আসে, তা ও তো তিতার ডিপো, পোক্তই হয়নি ছিঁড়তে গেলি কেন মইনুল? ভরদুপুরে তারা তো আর হাটবাজারে সওদা নিয়ে বসে নাই, তারা বসেছিল বাগানের ছায়ায়, গোপনে মেলেছিল জুয়া মদের আসর, ওদের পুত্র ইয়াররা। নির্বাচনে তোর বাপ কি ওদের পক্ষে থাকে যে তোর এতবড় সাহস! নেতার বাগানের ঘাস খাস তুই ওসমানের পোলা! মইনুল তুই ধস্তাধস্তিও করলি? তোর তো অসীম বুকের পাটা রে! এতগুলো চড় থাপ্পড় খেয়েও বাঁচতে চাইলি?’
হাত পা টসটস করে, কোনো জখম নাই, শুধু দাঁতে জিভটা ভীষণভাবে কেটে পাথারের ছোট্ট ডোবার চাপা কচুরিপানার ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিল। তা ও কি সেই মইনুল যে তার সাথে ছয় মাস ধরে স্কুলে যায় না, কেবল নদীতে ভেসে চলে যায়, রতনের চোখ জ্বলে, বন্ধুকে দেখবার সাধ জাগে, পানিতে নেমে সাঁতারই দিত বুঝি বাপে টেনে না ধরলে!
আর বকে চলে মন্টু, ‘কার মায়ের সন্তান, আহা, কোথা হতে এল এরা বাবা, কী হয়েছিল? আহাহা... এই বলতে বলতেই কোদালে কণ্ঠস্বর চেঁছে ফেলে, একটানে কফ থুথু কাদার মতো খেকড়ে নিয়ে ফ্যাকাসে মুখে সন্তানকে ভাই সম্বোধে, ‘ও ভাই গো, ইশশ্, উই যে উই যে, আরো তিনটা...!’
মন্টু সাকিদারের ঘোলা আয়না যখন চকচকে ছিল তখনকার সিন-সিনারির মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নদীতে এই রকম লাশ ভেসে যেত গণ্ডা গণ্ডা, সে না হয় তখন ঘটনা ছিল, সময় ছিল বিনিময় ছিল, কিন্তু ৪০ বছর পরে এই টাইমে নিজেদের দেশে এইভাবে লাশ ভাসে কেন? একই পরিবারের সুখের মানুষেরা কী কারণে মরে ভেসে যায়?
এইবার পুরুষটার মুখ ভালো করে দেখার জন্য সেনোয়া ব্রিজে চড়ে মন্টু, মনোযোগ দিয়ে দেখে, ‘ভালো মানুষ না সন্ত্রাসী? কার বাবা, ছেলে, ভাই, স্বামী? কোন জননেতা? আহা বুকটা মাছে ফুটো করল নাকি মানুষে?’
আরে জ্বালা, এ তো তাদের ইউনিয়নের রফিক মাস্টার! হায় হায় রফিক মাস্টার ইউপি মেম্বার হয়েছে বলে শরীরের মধ্যে ফুটো নিয়ে কেমন মরে ভেসে চলে যাচ্ছে পূণর্ভবা দিয়ে যমুনেশ্বরীর দিকে। মাত্র বারো শতক জমির ক্যাচাল, আপন রক্তের চাচা জ্যাঠারাই সন্ত্রাসী দিয়ে গুম খুন করল মাস্টারকে, নিখোঁজ নিখোঁজ, একদিন এইরকম পাঁজরে ফুটো নিয়ে ভুস করে ভেসে উঠেছিল নদীর ধারে পুরাতন কবরস্থানের জংলা ঢিবি ধ্বসে, ওই একই আদল, মন্টু সাকিদারের চিনতে একটুও ভুল হয় না, বলে, ‘তারও সিনা এর মতোই ওসার আছিলো’।
ব্রিজের নিচ থেকে রতন ডাক ছাড়ে, ‘ও বাবা, বাবা আরো দুইটা বাবা...!’ ছয়, আট, নাকি দশ, দেহরা ভেসে চলে যাচ্ছে, দুই পাড়ের নির্বাক দর্শক দেখে চেয়ে চেয়ে। দেখে আর গোনে। একবার নয় বার বার, এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়...।
লাশ গণনার দায়দায়িত্ব নিয়ে রতন রওনা দিল ওই মিছিলের সাথে নদীর ধার ধরে। লাশেরা পুনর্ভবা, যমুনেশ্বরী ছেড়ে করতোয়া, বাঙালির মধ্যে দিয়ে পথ করে চলতে থাকে। তুলসীগঙ্গা, নাগরে পড়ে ঝুপঝুপ, জলে আর্তনাদ ওঠে।
পাড়ে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে থেকে চেলোপাড়া ব্রিজের ওপর অনবরত ঢোক গিলতে থাকা রাসু পাগলি ছুটে আসে। উপুড় হয়ে নিরীক্ষণ করে। অশান্ত পাগলি উপুড় হতে হতে নিতম্ব চড়িয়ে ফেলে রেলিঙে। রাসুর জীবন্ত মুখের ছায়া পড়ে ওই নিচে বাদলা চুলের জলে। লাশ দেখার কসরতে কোমড়ের ছালার ঘাগড়া টুপ করে খুলে বেরিয়ে পড়ে তার উদোম পাছা। ভিড় তখন চমকে ওঠে। করতোয়া দিয়ে ভেসে যাওয়া যুবতী মেয়েটার নিম্নাঙ্গের সাথে দারুণ মিল পেয়ে যায় রাসু পাগলির নিম্নাঙ্গের, ঠোকরানো ক্ষত-বিক্ষত। ওই ভাসমান যুবতীর হাঁ-করা ক্ষতের মতো রাসু পাগলিরটাও তেমনি বিশাল কিনা দেখবার খায়েশ হলে জনগণের মনোভাব বুঝে ফেলে পাগলি। বসে যায় উরুদ্বয় ফাঁক করে, ক্ষত দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
তখন রাসুর স্বামী সুলতান মিঞা দৌড়ে আসে না এক টুকরো কাপড় হাতে বউয়ের লজ্জা ঢাকতে। তা সে দিতে পারত, রিকশা চালিয়ে যে আয় আসত তাতে সুশৃঙ্খলভাবে ঢেকে পরিয়ে সুখে রাখা সম্ভব ছিল, কিন্তু সম্ভব ছিল না পিচ্চি কালু গ্রুপের ‘আনন্দফূর্তি’র সহযোগিতায় পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দেবার। আর দিয়েছিল তো অর্ধেকটা, বাকিটুকুর অভাবে তারা এমন খেপল যে, কি রাসু কি সুলতান মিঞা তড়িঘড়ি বুঝে উঠবার সুযোগই পেল না, ততক্ষণে তারা দুদ্দাড় বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে মদমত্ত। ঘরে দু-একটা কিছু যা ছিল লণ্ডভণ্ড করেছে, তারপর সুলতান মিঞাকে ধরে পাউইয়ের সাথে বেঁধে রেখেছে। আনন্দফূর্তির বাকি টাকার পরিবর্তে সুলতান মিঞাকে সামনে রেখে আড়াই ঘণ্টা ধরে রাসুকে ধর্ষণ করে চলে গেছে।
সেই থেকে, সেই যে বাতায় গুঁজে রাখা কাগজের ঠোঙার কীটনাশক গেলাসে গুলে কুচকুচে কালো ঠান্ডা পানিগুলো ঢকঢক করে গিলে নিল সুলতান মিঞা, তারপর থেকেই তো রাসুর শুরু হয়েছে এই ঢোক গেলা ব্যারাম, সে নিজেকে ছেঁচড়ে নিয়ে ফেলেছিল, চুকচুক করে চেটেছিল স্বামীর কষের কালো তরল। ভাগ পায় না, জিভ যত লম্বা করে তত সে তরল সাঁ সাঁ করে ঢুকে চলে যায় সুলতানের কণ্ঠনালী বেয়ে পাকস্থলির ভেতর।
এদিকে ব্রিজে দাঁড়ানো পাবলিকের সিদ্ধান্ত এলোমেলো হয়ে যায়; তারা পা ফাঁক করে ক্ষত প্রদর্শনরত রাসুকে দেখবে না নদীতে ভেসে যাচ্ছে লাশ দেখবে? অথচ লাশগুলো যতক্ষণ ব্রিজের নিচ দিয়ে যাবে ততক্ষণই কেবল পাগলি তার নিম্নাঙ্গ প্রদর্শন করতে থাকবে, কেউ কেউ লজ্জা পেয়ে সরতে চাইল, কারো লিঙ্গ শক্ত হয়ে সাটসাট দাঁড়িয়ে যাচ্ছে আর ভেতরে ঘামে ভেজাভেজা দুর্গন্ধময় অন্তর্বাসের টাইট ইলাস্টিকের চাপে দমিত হয়ে গর্জাচ্ছে, ফুঁসছে।
ভেসে যাওয়া যুবতীর ফরসা ফুলো গলিত শরীর দেখেও কামে মাথা ঘুরছে অনেকের, না কি রাসুটাকে ধরে আবার গিলবে? সুলতান মিঞা তো নেই, পাউইয়ের সাথে বাঁধা না থাকলেও নেই, সরকারি হাসপাতালের ঘিনঘিনে বারান্দায় ভেজাল বিষের ধীর কার্যকারিতায় তড়পে তড়পে তিন দিন ধরে মরেছে। ব্রিজের রেলিংয়ে জিভ ছুঁইয়ে মনোযোগ দিয়ে রাসু দেখতে থাকে নদীর জল কুচকুচে কালো হয়ে গেছে কীটনাশকের দ্রবণে, যে জল কেটে ভেসে চলে যাচ্ছে সুলতান মিঞা।
ওদিকে এসব ভিড়ভাড়ে লাশ গুনতে ভুল হয়ে যায় রতনের, সে তো হেঁটে চলেছে ব্রহ্মপুত্রর পাড় ধরে মহানন্দা হয়ে পদ্মা দিয়ে আত্রাইয়ের পথে। লাশেরা খণ্ড খণ্ড মিছিল হয়ে যেন একত্রিত হতে চলেছে এ ভূখণ্ডকে জড়িয়ে রাখা নদীগুলো দিয়ে মহাসমুদ্রে।
কুশিয়ারা, সুরমা হতে ভেসে আসাদের দেখল কংস পাড়ের জীবিতরা, নদী চিকন বলে খুব নিকট থেকে, একেবারে মুখের কাছে মুখ নিয়ে দেখল, দেখে গায়ের গন্ধ পায়, চিনে নেয় শাঁখা দেখে, ‘কী হয়েছিল, পালাতে দেরি করে ফেলেছিল? নাকি নিজেদেরকে মূল্যবান গ্রহণযোগ্য ভেবে বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে ভিটে কামড়ে পড়েছিল? কী মিষ্টি মুখখানা, নাকটা দেখো তত্তরে কেমন। এমন সুন্দর প্রতিমা কোন ভাগ্যবানের বউ ছিল গো? আহা এমনি করে ভাসিয়ে দিল?
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হাতে এক পোঁচ নেভি ব্লু কালির আঁচড় নিয়ে ভয়ে ভয়ে ঢোকে বুথের গোপন কক্ষে। যদিও ওর আড়াল আড়াল হয়ে যায় সিঁদুরের আড়ালে। সকলেই নিশ্চিত সিঁদুর বধূ কোন চিহ্নে সিল মারে। বধূর মুখে বিন্দু ঘাম, কম্পিত সিল, ঠোঁট ভিজিয়ে সাবধানে ব্যালটের প্রতীক চিহ্নিতকরণের পূর্বপ্রস্তুতি দেখে মনে হয় ভিটের দলিলে দস্তখত করছে। এই দস্তখত কিঞ্চিত ওপরে অথবা দু ইঞ্চি নিচে পড়ে গেলে উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হবে, বিধর্মী মোল্লা মওলানার শরীক দল কি থাকতে দেবে দেশে? তবু শেষ রক্ষা হলো কই? যাদের পক্ষে সিল মারে তারাও কি বাঁচালো? সেই তো ভেসেই চলতে হলো।
‘তা বউটার পেট অতো ফুলো কেন? পানিই না পোয়াতী? পানিতে উপুড় বউয়ের পেট ঝোলে পাতার আড়ালে মিষ্টি কুমড়ার মতো। শান্তির মতোই কি ধবল এর গায়ের রং! শান্তিই কি? ভুল হয়ে যাচ্ছে, কী মতিভ্রম, এসব লাশটাশ এভাবে মনোযোগ দিয়ে দেখা ঠিক না!’ নদীতে পা ডুবিয়ে কাঁধে জোয়ালের মতো ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে তাই ভাবছিল ইছামতি পাড়ের চিত্তরঞ্জন। বাসের জন্য তাকায় বারবার, গন্তব্য সোনামসজিদ হয়ে ভারত।
বাস আসে না অথচ দূর রাস্তার মোড়ে লাল লাল ও কী নাচে, নড়ে চড়ে আবার আশ্চর্য! টকটকে লাল শাড়ি, তার ভেতরে একটা ধবধবে সাদা মেয়ে যেন, এগিয়ে আসছে হুহু করে, মরীচিকার মতো ঢেউয়ে ঢেউয়ে, দুটো বেণি নাচছে তাতে। ‘আহ দিদিনা, দিদিটা কী করছে এই জ্যামের মধ্যে, আর বাসস্ট্যান্ডে এভাবে পরি হয়ে কেউ আসে? লুচ্চা ছুঁয়ে দেবে যে, খামচে খুমচে ধরবে!’
চিত্ত দ্রুত এগিয়ে যেতে চায়, ‘শান্তিটা আর বড় হলো না, জামাইবাবু এই এক কারণে উঠতে বসতে কথা শোনায়, খানিকক্ষণ গাল ফোলাবে তারপর আবার যেই কে সেই, এত বাড় বেড়েছে, জামাইবাবু মানবে? দেখো কেমন গটগটিয়ে হেঁটে চলে আসছে থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে!’
‘এই হারালো, ভিড়ের মধ্যে পুরোই হারিয়ে গেল, না না ওইতো’! দিদি প্রথমবার মা হবে সেই খুশিতে চিত্ত লাল শাড়িটা কিনে দিয়েছিল, ‘তা কী আশ্চর্য, দিদি কই? শুধু যে শাড়িটা ভেসে বেড়াচ্ছে রাস্তার লোকগুলোর হাতে হাতে। এ ওকে হাত বদল করে দিয়ে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে পথ ধরে!’
চিত্ত দ্রুত এগোতে চায়, লাল রং আরো প্রকট হয়, একটা জটলার মধ্যে থেকে ভেসে আসে শান্তির নড়াচড়ার শব্দ। তা জটলার লোকদের হাতে শাড়ি কই? তাদের হাত ভরা চাপ চাপ শুকনো রক্ত।
হঠাত্ জনতার উল্লসিত চিত্কার উত্সব আমেজে ফিরে আসে চিত্ত, মেরুদণ্ডহীনের মতো হাত জোড় করে যেন বলে, ‘আমার দিদির শাড়িটা দিয়ে দাওনা, ওটা নিয়ে খেলোনা প্লিজ!’
সেদিন ওরা ওকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল, ‘নেংটিডা আইছে, ধর ওইডারে...’,
৫/৬ জন ননস্টপ চিত্তরঞ্জনকে মারছিল, সেই অবসরে সে চেয়ে চেয়ে দেখছিল, তাদের রুপালি টিনের চালা সোনালি রঙে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে যাচ্ছে, কী আলো! দাদার আমলের ভারী শাল কাঠের দরোজাটা পুড়ে কড়কড় করে খুলে পড়ল,
হুঁশ ফিরলে লক্ষ্মীর ভাঙা বীণার অংশবিশেষ দেখল চোখের ওপর, নড়ার উপায় নেই, রক্ত কষ্টের তীব্রতার মধ্যে ধুকপুক করছে জীবন। দিদিটা ওই দূরে তুলসীতলায় উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে, নিষ্প্রাণ, ওর পেটের চার মাসের বাচ্চাটা কি এখনো একটু একটু বেঁচে আছে? ওরা কজন উঠেছিল দিদিটার ওপর, ২০...৩০...৩৫...? বেঁচে আছিস রে দিদি?’
উত্তরে মা কাঁদে, বুড়ো বাবা ভেসে চলে যায়, বোকাসোকা বড়দা কাঁদে। ঘটি, বাটি, কাঁসা, নোড়া, চিত্পাত ট্রাঙ্ক, রাধাকৃষ্ণর গুঁড়ো উঠোনময় ছড়িয়ে থাকে। কাঁধে ব্যাগটা টাইট করে এঁটে চিত্তরঞ্জন একটু ফাঁকায় গিয়ে দাঁড়ায়। বাস চলে এসেছে, দিদি ভেসে যাচ্ছে ইছামতি হয়ে মধুমতির দিকে, উজান বাতাসে দিদির কান্না শুনতে পায় চিত্ত, ‘দাদা কই যাস, এই দেশটা কি আমাদের না?’
থপ করে চিত্ত ধরে ফেলে বাসের হাতল, ঘর্মাক্ত হাতল পিছলে ওকে ফেলে দিতে চায় মাটিতে, আবার ধরে, বাস যেন তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তবু চিত্তরঞ্জন জোর করে উঠে আসে বাসের অন্দরে।
চিত্তরঞ্জন পালিয়ে বাঁচতে চায় আর বংশী তুরাগ পাড়ের মানুষেরা জন্ম-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছায়া দেখতে পাচ্ছে শব মিছিলের শরীরে।
লইট্যা শুটকির ঝাঁক রোদে দিতে দিতে টিনের চালে বসে দেখছিল মোস্তফা, কুদ্দুসসহ প্রান্তীয় লোনা পানির মানুষেরা। ‘বনের দিকে যে ভেসে চলল ও কারা? তা কতগুলো ও গণক?’
এখন তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে গণতি ভুল হবার সম্ভাবনা তাই রতন একটুও না দাঁড়িয়ে আপন মনেই চলতে থাকে আর আওড়ায় ৮০, ৯০, ১০০।
ওদিকে তারাও কৌতূহলী নাছোড়বান্দা হাঁকে, ‘তা বাবা মরার বৃত্তান্ত কী, বাঘে ধরেছিল, কুমিরে? না না তা তো না, এখন তো উল্টো মানুষই তাদের ধরে বাঁধে, তা বাবা পুলিশে তাড়া করেছিল, না র্যাবে মেরেছে? তা এই, ও কিডা যায় পরান বাওয়ালী না? হ তাইতো মনে হয়, আর বাকিগুলান এরা কি কাঠচোরা নাকি জলদস্যু, ভূমিদস্যু, উগ্র ইসলামি সংগঠনের সদস্য, কোনো বিপ্লবী পার্টির সদস্য, নাকি সীমান্ত প্রহরী? অথবা সাদাসিদে পর্যটক, সাংবাদিক, নাকি শ্রেফ কারো কোলের সন্তান!’
রতনের গণনার বেশি সমস্যা যেগুলোর গলা নেই, শরীরের সাথে মাথা নেই, হাত-পা নেই, অথবা একটি হাত, একটি কান, দুটো পায়ের পাতা। যেমন ধরো, বুড়িগঙ্গার ওই মেধাবী ছেলেটা, বাবার বিস্তর টাকা ছিল, তো বাপ দেয়নি চাঁদা নাকি দিতে দেরিই হয়ে গিয়েছিল তা সে কত খণ্ড হয়েই না ভাসল!
গণনার একঘেয়েমি দূর করতে রতন এবার সংখ্যার সাথে ওদের নাম বসিয়ে দেয়, ‘ছাত্র, শিক্ষক, কবি, বাউল, রাজনীতিবিদ, গৃহিণী, শিল্পী, আপোষহীন লেখক, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, বখাটে।’
ভেসে যায় একটি শ্যামলা বরণ মেয়ে, তাকে দেখে আর কাঁদে তুরাগ পাড়ের মানুষ, ‘মেয়েটি কী ভালো ছবি আঁকত! বখাটে প্রমিকের অত্যাচারে মৃত্যুকে শ্রেয় করল’,
‘ওই যায় অজস্র শিশু তারা এখনো নারী হয়ে ওঠেনি, কব্জি সমান পুরুষাঙ্গ দেখে চিনে বুঝে উঠবার আগেই সেই ধারালো বেয়োনেট ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে শিশুর জননেন্দ্রিয় হয়ে হূদপিণ্ডের দিকে।
রতন ‘নামের’ বদলে এবার ‘কারণ’ যোগ করে, ‘ফাঁসের মৃত্যু, বুলেটের মৃত্যু, চাপাতির, ককটেলের, বোমার, এটা প্রকাশ্যে, এটা গুমখুন, এটা পুড়িয়ে মারা!’
অবশেষে রতন পৌঁছে গেলো মোহনায়।
টুপ-টুপ-টুপ; লতা, কুটো, খড়, শুকনো পাতার মতো গ্রাম, শহর, বন্দর, হাট, বাজার, সভা, মঞ্চ থেকে বর্জ্যের মতো দেহগুলো উড়ে উড়ে পড়ছে মহাসমুদ্রে।
আতাহার, দুদু, চানমিঞা, আযম, মহিমা, সিমি, বাপ্পি, সিহাব, তৃষা, সনি, ফাতেমা, রাবেয়া, শাজনীন, ইয়াসমিন, ডন, সাহানারা, মোফাজ্জেল, হাবিবুর, বুশরা, ফেলানী...
সংবাদপত্রের ঝুল মাকড়সা সরিয়ে সরিয়ে নামগুলো খুঁটিয়ে তুলছিলেন দেশের গবেষকগণ আর সংবাদপত্রের আর্কাইভকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে বিশেষজ্ঞ সাক্ষাত্কারে গণমাধ্যমে বলছিলেন, ‘মাত্স্যনীতি পরিচক্রের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছি আমরা, জলের নীতি স্থলে সংঘটিত হয়ে বর্তমান অবস্থা পুনরায় জলে নিমজ্জিত হচ্ছে, রাক্ষুসে পিরানহা রাজ্যটাকে বেছে নিয়ে স্বরাজ করতে লেগেছে তো। পিরানহাদের ডিম ফুটবার উপযুক্ত উষ্ণতম মৌসুম যেন এসেছে এইদেশের বায়ুমণ্ডলে, চমত্কার তাপঋদ্ধ উপাদেয় পরিবেশে তরতরে দাঁত নিয়ে কিলবিল করে অগণিত জন্মে যাচ্ছে ওরা। পরিবেশের এই রূপান্তর সূক্ষ্ম ও স্পষ্টতরভাবে ঘটে যাচ্ছে মানুষের সামনে, অসহায় মানুষ মৃত মাছের মতো সাদা বুক নিয়ে ভেসে যাচ্ছে।’
সাক্ষাত্কারের আবৃত্তিময় ছন্দে মনোসংযোগ করে রতন নিজেও বক্তৃতার মতো আওড়ায়, ‘সব শরীরই টসটসে তাজা গোলাপ ছিল স্যার। সৌরভ ছড়াতে পারত অথবা ছড়াত কিংবা ছড়াত দুর্গন্ধ। তাই কি এদের বাগান থেকে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে!
পূর্ণিমা আসমাদের এসিডদগ্ধ বিকৃত দেহ, রাবেয়া বিশ্বনাথের কোপানো দেহ, ধরাপড়া নেশাগ্রস্থ রোগাটে ছিনতাইবাজ ছোকড়ার পাকস্থলি যেটা বড় রাস্তার ওপর পাবলিকের পায়ে পায়ে মিশে গেল, মোসলেম উদ্দীনের অসাম্প্রদায়িক কবিতার খাতাটি পর্যন্ত ভেসে চলল যে স্যার ?’
দক্ষিণের লবণ নদীর চাল ধোয়া ঘোলা জলে যখন পড়ছিল শরীরগুলো, ঢেউ উত্তাল হলো হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান সবগুলোর ধাক্কায়, সেদিনই রতন খুঁজে পেল তার বাবা মন্টু সাকিদার পরিবার সমেত ওই লোনা নদীর মোহনায় একটি কুটিরে বসবাস করার জন্য পৌঁছে গেছে বেশ আগে এবং অপেক্ষা করছে ছেলের।
মন্টু সাকিদার রতনের সাথে কিছুটা বুঝপরামর্শের সুরে আলোচনায় আসতে চায়, ‘এরা যে গোর-চিতা পেলোনা রে বাবা, তার কী হবে, বল তো ?’
অথচ মন্টু নিজেও দেখতে পাচ্ছে বিশৃঙ্খল সমাজের বিকৃত মানুষের অসুস্থ শিকার এই লাশগুলোর ফ্যাকাশে চামড়ার পরত থেকে ধর্ম, বর্ণ, নাম, প্রজাতির প্রলেপ ধুয়ে গেছে, একটা কুিসত আগমনী সময়ের নমুনা হয়েও তারা পাড়ের মানুষদের সচেতন করতে পারছে না।
মন্টু সাকিদার এবার ব্যাপক ক্ষিপ্ত হয়, ‘গোনা আর মরার কারণ চটকান ছাড়া মানষের কি আর কোনো দায়-দায়িত্ব নাই?’
তারা সেইখানে একটা খড়ের চালা বানিয়ে নিয়েছে, গণনার অস্থায়ী জরিপ চৌকি, বাপব্যাটা পালা করে বসে।
প্রথম প্রথম আরও অনেক উত্কণ্ঠিত সঙ্গী ছিল এই সামিলে, ‘কাজকর্ম ফেলে এত ঠ্যাকা নাই, আরে এ তো শেষ হচ্ছে না, কবে শেষ হবে কেউ বলতে পারছে না।’ বলে তারা হাঁটুর মধ্যে মটমট শব্দ তুলে আলস্য ছাড়িয়ে কাজে চলে গেছে।
রতনের মা ডাকে কুটির থেকে, ‘তোমরা ক্ষান্ত দাও, আসো ঘরে আসো।’
মায়ের কথা কানে যায় না রতনের, হয়তো আর কদিন বাদে সেও উঠে চলে যাবে। আর কেউ গুনবেনা। এখন তবু সংখ্যা এরপর বিষয় হিসেবেও গণ্য হবে না। লাশ পচনের গন্ধে সকলে দারুণ অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।
এখনো রতন আঁতকে উঠে কষ্ট পাচ্ছে, দুর্গন্ধে ভেতরে গুলিয়ে উঠলে নাকে কাপড় চাপা দিচ্ছে।
ইদানীং বাবাটা চৌকির মধ্যে বসেই ঘুমে টোপে। ঘুমে ঘাড় ভেঙে পড়লে চমকে ওঠে,
সঙ্গীহারা হবার ভয়ে বাবার দিকে সাবধানে তাকায় রতন,মন্টুর চোখেও অন্যদের মতো একঘেয়ে দৃষ্টি।
গুঁতো মারে, ‘বাবা জাগেন, দ্যাখেন আরো সাতশ এসেছে, কোথায় নাকি লঞ্চ ডুবেছে বাবা... বাবা!’
ছেলের আর্তচিত্কারে মন্টু একটু সচেতন হবার চেষ্টা করলেও তার চোখ কথা শুনছে না।
রতন আবারও চেষ্টা করে, ‘বাবা, করতোয়ার পাড়ে এক শহরে তিরানব্বই হাজার বুলেট ও টন কে টন গান পাউডারের অবৈধ চালান এসেছে, তৈরি হোন, এত হাজার লাশ যখন আসতে থাকবে আমি একা পারব না... বাবা... গো’,
মন্টু অসম্ভব ক্লান্ত। তার ইচ্ছে করছে চৌকি দখল করে সটান হয়, রতন চলে যাক খোলা আকাশের নিচে।
কুটির থেকে রতনের মায়ের ডাক ভাসে, ‘রতন তোর বাপরে ঘুমাতে আসতে ক, কুপি নিভামু...’, তড়াক করে লাফ ছাড়ে মন্টু সাকিদার, রতন অসহায়ের মতো দেখে, ছোট ছোট ধাপে বাপ কুটিরের আপাত আরামে ঢুকে গেল।
রতনের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। নক্ষত্রের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে বসে থাকে চিন্তিত কিশোর, ‘তা মানুষ মরলে কি সত্যই তারা হয়? আকাশপ্রান্তের অস্পষ্ট তারাগুলো খসে পড়বার আগেই গুনতে শুরু করলো রতন। যে ঢল আসন্ন, এত আগেই গুনতে শুরু না করলে সে কি কুলিয়ে উঠতে পারবে শেষে?
ক্লান্ত হয়ে পড়ছে ছোট্ট ছেলেটি, বাবার মতো, দেশের আর সব জীবিতদের মতো সীমান্তের এই শেষ মানুষটিরও দুচোখ ভরে যাচ্ছে ঘুমে।
তবু সে বিড়বিড় করে, ‘লালটা তিরানব্বই হাজার তিন, নীলটা তিরানব্বই হাজার বিশ, হলুদটা...সোনালিটা... উজ্জ্বলটা... উত্তর কোণেরটা... দিগন্তেরটা...।