চাঁদ, প্রজাপতি ও জংলি ফুলের সমপ্রীতি

ইরোটিকস অব আর্ট অ্যান্ড কালচার

(পূর্বপ্রকাশিত-র পর) বগুড়া বেড়াতে গেছি বহুকাল পরে। আগের মতো আর নাই বগুড়া শহর। সময়ের ধাক্কা ও প্রহারে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। হকসেদ, আমি ও আরও কয়েকজন—একসঙ্গে হাঁটছি বগুড়ার পথে ও অপথে, বসন্তসন্ধ্যার মৃদুমন্দ হাওয়ার ভেতর। আকাশে বিচিত্র রঙের খণ্ড-খণ্ড মেঘ-মেঘেনী—ধূসর, শ্যামবর্ণা, চিনিগুঁড়া, ঘিয়ে-শাদা, রাধাচূড়া, অঙ্গাররঙা... কত রকমারি রঙবাহারি মেঘ! হালকা বাতাসে মেঘেরা ঘুরে-ঘুরে মিলে-মিশে খুব স্লো-মোশনে তৈরি করে যাচ্ছে বিচিত্র সব ছবি, আকাশের ক্যানভাসে—চি-হি-হি আওয়াজসহ লাফিয়ে-ওঠা ঘোড়ার আকার, কিংবা বেমক্কা হাই-তোলা নাদুসনুদুস জলহস্তীর প্রতিকৃতি, কখনো ড্রাগন, কখনো দেবদেবী ও ফেরেশতাদের ঝাপসা সিল্যুয়েট, আবার কখনো-বা ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে দাঁড়ানো আবছা কৃষ্ণমূর্তি। উদ্যানের দক্ষিণ পাশে বহুপুরেনো এক ছাতিম গাছ। তার নিচে ঘাস ও ঝরাপাতার ভেতর সাতভাইচম্পা পাখিরা মেতেছে বেলাশেষের কলহকাণ্ডে। এই তো, আর কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে ঝেঁপে আসবে অ্যাশফল্টের ঘন ধূলিধোঁয়া রঙের ছোপ-ছোপ সন্ধ্যা। থেমে যাবে পাখি ও পতঙ্গদের খুচরা খুনসুটি ও কোলাহল। জেগে উঠবে ঝিঁঝিঁ পোকাদের গুঞ্জন, আর থেকে-থেকে কুনোব্যাঙদের কড়কড়-ধ্বনি। জোনাকিদের তলপেট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলতে-নিভতে থাকবে বিন্দু-বিন্দু লুসিফেরিন। মাটির নিচে মৃদু কলরোল করতে থাকবে ঝিলমিলে খনিজ ও তরল, আগের মতোই। আমি যে একসময় বগুড়ায় থাকতাম, আমার নাম যে মাসুদ খান, জানে না হকসেদ। আমি কে বা কোত্থেকে, কিছুই জিজ্ঞেস করেনি সে, আর আমিও বলিনি কিছুই। উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরির খোলা মাঠে বসেছে সাপ্তাহিক সাহিত্য-আসর। কবিরা কবিতা পড়ছে, গল্পকারেরা গল্প। বিচারকেরা করছে গুণাগুণ বিচার। কবিতা পড়তে এসেছে বাবা-মেয়ে দুজনে একসাথে। বাবার লেখা মেয়ের লেখার চেয়ে গুণে-মানে অনেক ভালো, কিন্তু বিজ্ঞ ও সমঝদার বিচারকেরা চশমার আড়ে বারবার তাকাচ্ছে মেয়েটির দিকে আর তার কবিতার প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে অনেক কিছু। এতে পিতাপুত্রী দুজনেই বেশ বিব্রত হচ্ছে। কী দরকার ছিল বাবা, বাপ-বেটি একসঙ্গে কবিতা পড়তে আসার! এমন সময় হকসেদ আচমকা বলে উঠল, ‘হেই ওইদিক যাইস না তোরা, কবি-সাহিত্যিকগো দুনিয়া ক’লাম এক আজিব ঘিরিঙ্গি দুনিয়া... সাহিত্যিকগো ভিের যে এত ঘিরিঙ্গি... কী আর কমু! আরে ব্যাটা, কবিতা সাহিত্য এইগুলা হইলো গিয়া পিওর আর্ট। আইজকাল দেখি পিওর আর্টের মধ্যেও পারফর্মিং আর্টিস-ভাব ঢুইকা গ্যাছে আচ্ছামতন। কবিসাহিত্যিকগুলা দ্যাখোস-না নাম কামাইবার জন্যে কীই-না করে আজকাইল! দাপট দেখায়, দল পাকায়, খিচড়ি পাকায়, গু ছিটায়, আবারফির হেই গু-মাখামাখি নিয়াই—স্বার্থের লাইগা, নাকি কৌশল কইরা, বুঝি না ঠিক—একজন আরেক জনোক জড়ায়া ধরে। আরে, গুয়ের তো একটা বিহিত করবি আগে, নাকি? তা না, গু-মাখা নিয়াই লেপচালেপচি... আর খালি জিল্লিক পাড়তে থাকে। মনে করে জিল্লিক পাড়তে পাড়তেই বড় বড় কবি-সাহিত্যিক হইয়া যাইতেছে-গা একেক জন।’ একটু থেমে, সবার মুখের ওপর দিয়ে হালকা একটি জরিপ চালিয়ে নিয়ে আবার বলতে থাকে হকসেদ, ‘দ্যাহোস-না, পারফর্মিং আর্টিসগো লাহান এইহানেও শুরু হইয়া গ্যাছে ফারুক-ফিচারিং-ফ্যান্সি, কুলা-ফিচারিং-মুলা... আবারফির মুলা-ফিচারিং-কুলা। আরে ব্যাটারা, এইটাও বোঝোস-না, দুইটা দুই ঘর, দুই ঘরানা... পারফর্মিং আর্টিসরা জাইগা থাহে বসন্তের কয়েকখান দিন... আহা ওইটুক্কা সময়ের ভিেরই তাগো আলো-বাতাস-নাম-কাম-মাল-তাল-জেল্লা-জৌলুশ সবই কামাইতে হয়, হের লাইগা তারা না-হয় ডগমগায়... কিন্তুক তোরা শালা কবি-সাহিত্যিক, তোরা ওইর’ম করস ক্যা? আজকাইল শালার সাহিত্যিকগুলার পারফর্মিং আর্ট তো দেখি হনুমানের আর্টরেও ছাড়াইয়া যাইতেছে-গা। আরে, বোঝস-না ক্যান ব্যাটারা, রিয়াল কবি-সাহিত্যিকগো তো এক বসন্ত বাঁচলে চলে না, তাগো বাঁচতে হয় এক যুগ পার হয়া আরেক যুগ, অনেকগুলান শীত গ্রীষ্ম বসন্ত... কী কস মোমিন? ঠিক কিনা? আরে! কথা কস না যে?’ ‘আর ওই যে দুইটা গ্রুপ দেখতাছস, এক গ্রুপ গিয়া বইছে ওই যে হাজামজা ডোবাটার ওই পাড়োত, হোগলা আর শিয়ালমোতা গাছের ধারোত, আর এই দ্যাখ্ ডোবার এই পাড়োত আরেক গ্রুপ, বিলাই-সুমসুমি ঝোপের ধারোত। দেখছস তো? ঠিক আছে? অরা কী করে জানোস? অরা বানায় পর্নোগ্রাফি, ‘পর্নোগ্রাফি অব পোয়েটিক সাকসেস’, মানে হইলো-গিয়া খ্যাতির পর্নোগ্রাফি, সাফল্যের পর্নোগ্রাফি। পোয়েটিক সাকসেস শুইনা আবার-জানি মনে করোস না যে খালি কবিসাফল্যের কথা কইতাছি। ওইটা মনে কর, ওই যে ‘‘পোয়েটিক জাস্টিস’’ না কী-জানি একটা টার্ম আছে-না—‘‘কিরে চলমান থেসারাস, কথা কস না ক্যা?” বলেই কোঁকড়া চুলের চশমা-পরা ছেলেটির জুলফি ধরে টান মারে হকসেদ—‘তো ওইটার লাহান একটা টার্ম হইলো-গিয়া এই ‘পোয়েটিক সাকসেস’। কিরে, চলন্ত চাউলের বস্তা, বুঝলি কিছু?’ বলেই হকসেদ বাঁ-পাশের থুলথুলা ছেলেটার ভূঁড়িতে দিলো একটা রাম খোঁচা। দিয়েই আবার বলতে লাগল, ‘নেম-ফেম-সাকসেসের সুখটা তো মনে কর যৌনসুখের মতনই, ঠিক কি না? কিরে কোঁকড়া, তুইও তো দুই-চার কলম ল্যাখোস, যা ব্যবস্থা-উবুস্থা কর, মালকড়ি ঢাল, তোরেও সাকসেস-পর্নোর নায়ক বানায়া দিবো, পাক্কা। বাংলাসাহিত্যের নায়ক, নায়করাজ এইগুলা না-হয় হইতে পারবি না, তয় শিওর, সাইড-নায়ক হইতে পারবি। শোন, তরিকা আছে দুইটা : একটা ডাইরেক্ট অ্যাকশন, আরাকটা ইনডাইরেক্ট। একটা অ্যাক্টিভ পর্নোগ্রাফি, আরেকটা প্যাসিভ। ডোবার ওইধারোত যে গ্রুপটা, ওইটা বানায় অ্যাক্টিভ, আর এই পারেরটা প্যাসিভ। অ্যাক্টিভ গ্রুপটা রাজধানী থেইকা হরহামেশা হেভিওয়েট সব সাহিত্যিকগো দাওয়াত কইরা আনতাছে। তারা আইসা সমানে সাট্টিফিকেট দিতাছে কে সাহিত্যের নায়ক, কে নায়িকা, আর কে কে নায়করাজ, নায়করাজ্ঞী। প্যাসিভগুলার তরিকা অবশ্য আলাদা। সবই বুঝতে পারবি, আহিস্তা-আহিস্তা... যা-গা, অহন যেই তরিকা তর পছন্দ হয়, যেইটা করবার চাস, যা করেক-গা। কাম হইব কইলাম, শিওর। ‘ইরোটিকস অব আর্ট অ্যান্ড কালচার’ যে কী জিনিস বুঝতে পারবি ভাবমতন।’ কথার তুফান মেইল ছুটিয়েছে হকসেদ। অনর্গল বকে চলেছে আজ। বলে, ‘সাহিত্যের কথা যখন উঠলই, মনে হইল কই আরেকখান কথা, এই যে বোগড়ার কতক ছোলপোল, এইগুলার যে কী হইছে বুঝি না, কবিতার কথা উঠলেই খালি কয় ‘মাসুদ খান’ ‘মাসুদ খান’। হেই ব্যাটা নাকি একসময় আছিল এই বোগড়া শহরোত। অহন কই-জানি থাহে... গুয়াতেমালা, নাকি পাপুয়া নিউগিনি, না কই-জানি-কই এক জঙ্গলের দ্যাশোত থাহে। গরিলা, গণ্ডার, প্যাঙ্গোলিন এইগুলার সাথে বইসা কবিতা ল্যাখে আর তাগো কবিতা হোনায়। ক্যাংকা জানি সব খটোমটো কবিতা-টবিতা লেখত হেই ব্যাটা আর তাই নিয়া অ্যাজলা কবিগুলা হুদাই লাফাইতে থাকত অজগবি। অহন আর লেখেটেখে কিনা জানি না, তবে ওইটারে পাইলে হইত একবার, এক চটকনা মাইরা বুঝায়া দিনু-হনে কবিতা কাক কয়, আর কয় প্রকার।’ হকসেদের কথার আতসে গা জ্বলতে শুরু করেছে আমার। কিন্তু কথার যে তুবড়ি সে ছুটিয়েছে আজ, সেই তোড়ে তো এমনিতেই ভেসে যাচ্ছে সব, তার ওপর আবার আজ কেন-জানি-না হাতের কাছে যাকেই সে পাচ্ছে, তাকেই হয় থাপ্পড় মারছে ঠাস-ঠাস করে, নয় তো দিচ্ছে রাম খোঁচা। এই তো কিছুক্ষণ আগে আমাকেও একটা চটকনা মেরেছে বেমক্কা। আমিই যে মাসুদ খান, ভয়ে ও সংকোচে বলি না তা, খামোশ মেরে থাকি। (চলবে...)