চিহ্ন :কথাশিল্পের কারুকর্ম

ছোটকাগজ আলোচনা বছরের হিসাবে চিহ্ন এবার পনেরোতে। সংখ্যায় ছাব্বিশ। পরিকল্পনার কেন্দ্রে ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক। কেননা, দেখতে দেখতে আমরা চলে এসেছি একুশ শতকে। হঠাত্ পেছন ফিরে উনিশ শতকের বঙ্কিমচন্দ্রের কাল পর্যন্ত দৃষ্টি প্রসারিত হলে মনে হয় যেন কতো পুরোনো কথা! অথচ দুর্গেশনন্দিনী বা বিষবৃক্ষ পাঠ করতে গিয়ে ধারণা হতে পারে কিছুই ততটা পুরোনো নয়। আবার আজকের বাংলাদেশে সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, হুমায়ূন আহমেদ ও শহীদুল জহিরের কথা ভাবতে বসলে বোঝা যায়, দূরত্বটা অনেকখানিই। কালের অভিঘাতে বঙ্গরমণীর মতো কথাশিল্পের ভাষারও অনেক বিবর্তন হয়েছে, ওর সংকোচের বিহ্বলতা কেটে গিয়েছে, সে একা সাঁতরে সমুদ্র পার হতে পারে। কিন্তু এই যাত্রার শুরু হয়েছিল কবে, কিভাবে, কারা একে দুর্মর-অভীপ্সার পথ দেখিয়েছেন, হাত ধরে এগিয়ে এনেছেন একালের দোরগোড়া অবধি? চিহ্ন-র এবারের সংখ্যায় তারই খোঁজ আছে। খোঁজ করেছেন প্রখ্যাত সনত্কুমার সাহা, হাসান আজিজুল হক থেকে এ-প্রজন্মের মর্মরিত ঊষাপুরুষ পর্যন্ত আঠারো লিখিয়ে। নানাভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরত্, বিভূতি, তারাশঙ্কর, সতীনাথ, মানিক, ওয়ালীউল্লাহ্, সমরেশ, শ্যামল, সৈয়দ হক, আবুবকর সিদ্দিক, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, হুমায়ূন আহমেদ ও শহীদুল জহিরের কথাশিল্পের কারুকর্ম। আছে কথাশিল্প বিষয়ে হাসান আজিজুল হকের একক বাচন। উপন্যাসের ভাষা নিয়ে লিখেছেন জাকির তালুকদার। সেলিনা হোসেন লিখেছেন—‘কী লিখি কেন লিখি’। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও কমলকুমার মজুমদারকে নিয়ে আছে আরও দুটি ভিন্ন গদ্য। এভাবে কথাশিল্প বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পাঠ’ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে চিহ্ন। সে-কারণে এ-সংখ্যাটি বাংলা সাহিত্যের নিবিড়-পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—লেখাগুলোর চিরত্বগুণের জন্য নয়, বরং বাংলা কাথাসাহিত্যের মূল-প্রবণতার নেপথ্যে আলোকসম্পাতি বলে। এগুলো ছাড়া নিয়মিত বিভাগসমূহ তো আছেই। সেখানে লিখেছেন রকিবুল হাসান, শামসুন নাহার, তসলিম খান রানা প্রমুখ। শরীফ আতিক-উজ-জামান অনুবাদ করেছেন চিনুয়া আচেবে থেকে। প্রান্তিক প্রতিভার প্রাকৃতকথনে উঠে এসেছেন নিভৃতচারী সাহিত্যকর্মী ‘মনের নবাব’ সিরাজউদ্দৌলা। বিপ্লবী হুগো শ্যাভেজকে নিয়ে লিখেছেন মীর মোশাররফ হোসেন। এছাড়া রয়েছে শহীদ ইকবাল-এর ধারাবাহিক ট্রিলজি সমস্ত ‘ধূসর প্রিয়’। সব মিলিয়ে সৃজনশীলতা ও বিচিত্রতায় একটি নির্ভরযোগ্য সাহিত্যের কাগজ হিসেবে বরাবরের মতো এবারও চিহ্ন তার চারিত্র অটুট রেখেছে।