তালিবাজদের আর কত সুযোগ দেব?
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৪, ২১:১৭
ব্যান্ড মিউজিকের এমনিতেই ক্রান্তিকাল চলছে। অডিও ইন্ডাস্ট্রির এই নাজুক অবস্থায় সর্বশেষ কবে ওপেন এয়ার কনসার্ট হয়েছে এটা হয়তো ব্যান্ড আর্টিস্টরাই হলফ করে বলতে পারবেন না। এ দুঃখ, এ লজ্জা আমাদের সবার। এর ভেতরে বিসিবি সেলিব্রেশন কনসার্টকে ঘিরে মাইলস ও এলআরবি এই দুই শীর্ষ দলের ভেতরে যে ভার্চুয়াল যুদ্ধ শুরু হয়েছে, দেশের ব্যান্ডদলগুলোকে ওয়ার্মআপ শিল্পী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; তা কখনওই কোনো ব্যান্ড মিউজিকপ্রেমীদের কাছে ভালোলাগার কথা না। কারণ পুরো আক্ষেপ, অভিযোগ বা মন কষাকষির মূল বিষয়ে ছিল সেদিনের কনসার্টের বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। সেই তর্কেও আমি যাচ্ছি না। এই সেলিব্রেশন কনসার্ট থেকে হয়তো প্রাপ্তি—সময়ের লিজেন্ড এ আর রহমানের বাংলার মাটিতে কিছু গান। কিন্তু বড় আক্ষেপ আর অপ্রত্যাশিত ঘটনা হলো মাইলস ও এলআরবির মধ্যে তৈরি হওয়া এই দ্বন্দ্ব। ঘটনার কেন্দ্রে কে আছে, কী কারণে হয়েছে, কে মূল দোষী, কে দোষী না, কে ক্ষতিগ্রস্ত, কে লাভবান—এইসব হিসাব-নিকাশ করলে হয়তো অনেক কিছুই বের হবে। কিন্তু তাতে সবচেয়ে ক্ষতি হবে যে, দুই শীর্ষ দলের ভেতরকার দূরত্ব বাড়বে। যা হয়তো আমাদের ব্যান্ড মিউজিকের ঐতিহ্যকে আরও ক্ষুণ্ন করবে।
মাইলসের শাফিন আহমেদ বলছেন, ‘এনাফ ইজ এনাফ! এর বিহিত হতেই হবে। আমরা বড় করে এর প্রতিশোধ নেব।’ অন্যদিকে এলআরবির আইয়ুব বাচ্চু বামবা থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন তাদের ব্যান্ডের নিজস্ব প্যাডে। এই ধরনের অস্বস্তিতে ফেসবুকের অগণিত ইউজাররা এখন তাই দুই ভাগে বিভক্ত। দেশীয় আয়োজক বা ইভেন্ট আয়োজকরা আগে প্রতি মাসে শীত কিংবা গ্রীষ্মে আর্মি স্টেডিয়াম বা অন্য যেকোনো ভেন্যুতে দেশীয় ব্যান্ডের কনসার্ট আয়োজন করত। তারা এখন কোথায়? এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ভারতীয় বা বিদেশি শিল্পীরা। এই ব্যর্থতা বা এই লজ্জা সামগ্রিকভাবেই ঠেকাতে হবে। ঠিক এই সময়ে এ আর রহমানের কনসার্টে কে কী করল, বা কে ষড়যন্ত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এই বিষয় না ঘেটে এখন আমাদের সম্মিলিতভাবে দেশীয় শিল্পীদের প্লাটফর্ম মজবুত করতে হবে। এমনিতেই রয়্যালিটি আর ইন্টেলেকচুয়াল কপিরাইট নিয়ে আধুনিক শিল্পী আর ব্যান্ড দলের বিভক্তি অনেকদিনের। রয়্যালিটি নিয়ে যুদ্ধাবস্থায় আছে প্রকাশক আর শিল্পীরা! এ সমস্ত কারণে ঠকছে আসলে গোটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি। আর এই বিরোধের সুযোগে লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। আমরাই এই সুযোগ গড়ে দিচ্ছি। এই চরম অবস্থায় বিসিবি সেলিব্রেশন কনসার্টের কিছু ভুলকে কেন্দ্র করে তৈরি হলো বিভক্তির ভেতরে আরেক বিভক্তি। এতে কোন পক্ষ লাভবান হবেন? অবশ্যই তৃতীয়। যারা এখন তালি বাজাচ্ছেন। এলআরবি-মাইলস আপনারা তালিবাদকদের আর জেতাবেন না প্লিজ। আগামী প্রজন্মের জন্য হলেও বিষয়টি ভাবুন। এ নিয়ে ইত্তেফাক বিনোদনে ও বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে অগণিত পাঠক-দর্শকেরা এবং একেক পক্ষের মিউজিশিয়ানেরা (সঙ্গত কারণেই নাম প্রকাশ করছি না) বলতে চাইছেন একে অন্যের বিরুদ্ধে! কিন্তু এই কাঁদা ছোড়াছুড়ি যদি এই অবস্থায় মিডিয়াকর্মী হয়ে আমরাও করতে শুরু করি, তাহলে তো বিরোধের কোনো নিষ্পত্তি হবে না। বরং আমরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে যাব। মাইলস গান গাইতে পারেনি (যে কারণেই হোক), এটা আমাদের দেশের জন্য অমর্যাদাকর এক বিষয় হয়েছে। একই সাথে একে কেন্দ্র করে এই বিভক্তি আমাদের সংগীতাঙ্গনের জন্য আরও বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে। পুরো মিউজিক অঙ্গন এখন কানাকানিতে ব্যস্ত—কে কার পক্ষে কথা বলবেন। চ্যানেলগুলোও হয়তো এই সুযোগটা নিতে চাইবে। কিন্তু আমাদের সবার উচিত হবে এই দুই দলের ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটানো।
আইয়ুব বাচ্চুর মোবাইলের ওয়েলকাম টোনে যেমন বাজে ‘সবাই আমরা একরকম না, সব মিলিয়ে তবু এক’। তেমনি সেল কোম্পানির এই গানের সূত্র ধরেই আমাদের এখন এক হওয়ার সময়। আমরা আর কত বিভক্ত হব? নিজেদের স্বীকৃতি নিজেদের সংগীত চেতনা বা এইসব বিষয়ের বড় বড় বুলি টকশোতে শুধু না বলে আসুন আমরা এক হই। সমস্ত ইভেন্ট আয়োজকদের বলা হোক কমপক্ষে ১০টি দেশীয় বড় কনসার্ট না আয়োজন করলে সেই প্রতিষ্ঠান বাইরের শিল্পী আনতে পারবে না। এইরকম ভাবে আমাদের গানের অর্থ সম্মানীর বিষয়েও সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করা হোক। কিন্তু এগুলো না বলে যদি একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করি, তাহলে এমনিতেই তো নিঃশেষ প্রায় মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি তার বাকি গর্বটুকুও হারাবে। যা আমরা কেউই চাই না। ফেসবুকে অধিকাংশ তরুণরা এখন বিদেশি গান, বিদেশি মুভির সূত্র ধরে স্ট্যাটাস দেয়। মিউজিশিয়ানদের নিজেদেরই এই চর্চা থেকে ফেরাতে হবে।
নব্বই দশকে চিকিত্সার সাহায্যার্থে হলেও প্রতি মাসে পাঁচতারা হোটেলগুলোতে ৬ থেকে ৭টি বড় আয়োজনের কনসার্ট হতো। যাতে জীবন বাঁচতো অনেকের। দেশের শীর্ষ ব্যান্ডদলগুলো এক মঞ্চে এলেই তারা লাখ লাখ টাকা উঠিয়ে জীবন বাঁচাতো সাধারণ মানুষের। প্রশ্ন হলো—আমাদের কি এখন আর কারো সাহায্যার্থে চ্যারিটি কনসার্টেরও প্রয়োজন হয় না? ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী বা কিডনি বিকল হওয়া মানুষ কি বাংলাদেশে এখন আর একটিও নেই, যার জন্য চ্যারিটি কনসার্ট হতে পারে? নাকি শুধু থার্সডে নাইটে বিদেশি শিল্পীদের চড়ামূল্যে টাকা দিয়ে নাচবই শুধু! আমরা আর কত থিতিয়ে যাব? ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ বিষয়টি অনেক গভীর, অনেক বড় পরিসরের। আমরা এখন অন্তত এক হয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা শুরু করি। নিজেদের এই হাজার ক্ষতগুলোকে মলম দিই আসুন। আর নতুন কোনো ক্ষত হোক তা চাই না। এলআরবি-মাইলসের সদস্যবৃন্দ প্লিজ দেশের সবচেয়ে সিনিয়র ব্যান্ড দল হিসেবে নিজেদের রাগ-অভিমান ভুলে সম্প্রীতির নতুন উদাহরণ তৈরি করুন। অন্তত আপনার আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে হলেও করুন। আকুল অনুরোধ রইল আপনাদের প্রতি।
শেষে দলছুট ব্যান্ডদলের বাপ্পা মজুমদারের সামপ্রতিক স্ট্যাটাসটাই আবারও বলি, ‘আর যুদ্ধ চাই না। শান্তি চাই। শান্তি চাই। শান্তি চাই।’ আসুন সবাই মিলে তবু এক হই।