সমস্যা নিজেদের হলে সমাধানের উদ্যোগও নিজেদেরই নিতে হয়
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৪, ২৩:২৩
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় অন্যদের দোষারোপ করার আগে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ দেশ আমাদের, সমস্যাও আমাদের। তাই সমস্যাও আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক কর্মপরিকল্পনা। এরপর বিদেশের কাছে সাহায্য বা ক্ষতিপূরণের কথা ভাবতে হবে। অন্যথায়, পরিকল্পনা ছাড়া বিদেশি সাহায্যও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। মন্ত্রী গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘টুওয়ার্ড বাইন্ডিং ক্লাইমেট চেঞ্জ এডাপ্টেশন রিজীম:এ প্রপোসড্ ফ্রেমওয়ার্ক’ শীর্ষক একটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, পরিবেশ দূষণের জন্য শুধু অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালা মেলে লাভ নেই। নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে সমস্যা সমাধানের উপায় বের করতে হবে। যে নিজেকে নিজে সাহায্য করতে পারে না, সে অন্যদেরও কোনো সাহায্যে আসতে পারে না- আমি এই মতাদর্শে বিশ্বাসী। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এখন আমরা বিশ্বের অনেক দেশের নাম ধরে-ধরে অভিযুক্ত করছি, বলছি তোমাদের অমুক শিল্প বন্ধ কর। কিন্তু যদি নিজেরা নিজেদের কাজটি না করি, তাহলে একসময় হয়তো ওই বিদেশিরাই বিপরীত কথা আমাদের বলবে।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বিদেশিদের সাথে আমাদের কথা ছিল-তোমরা আমাদের কাঁচামাল নাও, সেগুলো দিয়ে পণ্য বানিয়ে আমাদেরও দাও, নিজেরাও ব্যবসা করো, শর্ত ছিল-তোমাদের জিডিপি’র একাংশ আমাদের দিতে হবে। কিন্তু সেখানে নিজেরা নিজেদের কাজ করতে পারিনি বলেই শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্ষুদ্র-ঋণ ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। নিজেদের পুঁজি গড়তে পারিনি বলেই তো এটা হয়েছে। কাজেই পরিবেশ রক্ষায় আগে আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা কি করতে চাই। পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, এজন্য আমি আমার মন্ত্রণালয়কেও বলেছি, আগে বাস্তবমুখী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে। অন্যদের বোঝাতে সক্ষম হতে হবে যে, আমি নিজের দায়িত্বটি পালন করেছি, নাহলে শুধু সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো ফল হবে না।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের অপচয়ের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা রোধে সবারই করণীয় আছে। যেমন হাজারীবাগের ট্যানারী শিল্পের দূষণ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষায় অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি পরিবেশের কথাও অবশ্যই ভাবতে হবে। ট্যানারী শিল্পের মালিকদের নিজেদেরই উদ্যোগী হয়ে দ্রুত এটা অন্যত্র সরানোর তাগিদ অনুভব করতে হবে। অন্যথায় দেশের ও মানুষের স্বার্থেই পরিবেশ মন্ত্রণালয় নিজের করণীয় ঠিক করবে। একই কথা ইটভাটার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, জুনের পর তাদের আধুনিক প্রযুক্তিতে ইট পোড়াতে হবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রফেসর ড. মিজান রহমান রচিত গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি প্রফেসর আ.ন.ম মেশকাত উদ্দিন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্্দীন মালিক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আমিন সরকার ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আইনুন নিশাত প্রমুখ।
ড. শাহ্্দীন মালিক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যে যেসব কারণে পরিবেশ নষ্ট হয়, সেসব কাজের ব্যবহার কমাতে হবে। পরিবেশ ধ্বংসকারী জিনিসপত্রের ব্যবহার কমানো উচিত। পাশাপাশি পরিবর্তিত পরিবেশে জীবন যাপনে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এজন্য দরকার এডাপ্টেশন। যেহেতু অন্যদের কারণে আমরা খেসারত দিচ্ছি, সেজন্য এডাপ্টেশনকে আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করার কথা আসছে। তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণের জন্য অন্যদের কাছে সাহায্য পেতে হলেও এর পেছনে আইনি শক্তিটা বড় প্রয়োজন।
পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হয়ে বিদেশের কাছে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আইনি সমর্থনটা থাকা খুব জরুরি। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা, মিটিগেশন, এডাপ্টেশন এবং নিজেদের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধি।
গ্রন্থকার প্রফেসর মিজান রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ব উন্নয়নের পথেও বড় ধরনের বাধা। আমাদের মতো ভুক্তভোগী দেশগুলোকে শুধু বিদেশের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কিছু হবে না, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির আইনি ভিত্তি দাঁড় করানোর সক্ষমতা থাকা উচিত।