যমুনার ওপারে উদ্যোক্তাদের চোখ

সস্তা শ্রম ও জমির দাম বিবেচনায় দেশের উত্তরাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। তাদের চোখ পড়েছে যমুনা নদীর ওপারে, যেটা হতে পারে একটি অর্থনৈতিক এলাকা। এখুনি যেতে প্রস্তুুত তারা, শুধু দরকার কিছু সহায়ক সুবিধা। ঝামেলাহীনও হবে বলে মন্তব্য করেন কেউ কেউ। সাভার, আশুলিয়া, চন্দ া ও কালিয়াকৈরসহ আশপাশের এলাকার শিল্প মালিকরা সবসময়েই আতঙ্কে থাকেনঃ এই বুঝি কারখানায় হামলা হলো, ভাংচুরে নামলো শ্রমিক নামধারীরা। এখানে গার্মেন্টস শিল্পের কমপ্লায়েন্স কারখানা রয়েছে। আরো আছে বিভিন্ন বস্ত্র, বিস্কুট, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স, কৃষি ও খাদ্য শিল্প প্রভৃতি কারখানা। এসবের মধ্যে কোন কোন কারখানা বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট শিল্পে ‘পাইওনিয়ারও’। গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার অজুহাত তুলে ওসব কারখানায়ও হামলা-ভাংচুরের ঘটনা ঘটানো হয়। কিন্তুু কেন-কি উদ্দেশ্যে, সে রহস্য থেকেই যায়। অথচ ব্যক্তি উদ্যোগে তিল তিল করে গড়ে ওঠা বিশাল শিল্প কমপ্লেক্স একদিনে হয়নি। লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে এসব প্রতিষ্ঠান। কিন্তুু সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা লক্ষ্য করা যায়। যার ফলে আগুন আর ভাংচুরের খেসারত দিচ্ছেন নিরীহ শ্রমিকরা। গত ২০ বছরে গার্মেন্টসে আগুনে পুড়ে এক হাজারের বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তারপরও টনক নড়েনি কারো। উদ্যোক্তারা বলেন, ব্যক্তিখাত বিকাশে সরকারের উচিত ছিল সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কিন্তুু তা হয়নি। এমনকি এখনো শ’ শ’ কারখানা রয়েছে যেগুলো গ্যাস সংযোগ পায়নি। তরল গ্যাস দিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে চলছে ছোট ও মাঝারি আকারের কিছু কারখানা। তাতে ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে যা বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যকে বেশি প্রতিযোগিতায় ফেলে দিচ্ছে। বিজিএমই-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, যে সব এলাকায় গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেছে সেখানেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় সক্ষমতার অন্তত অর্ধেক কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, রাজশাহী ও বগুড়ামুখী মহাসড়কের সন্নিহিত এলাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস বিদ্যুতের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সহায়তাসহ পরিকল্পিত অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হলে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। ওইসব এলাকায় তুলনামূলক কম দামে শ্রম পাওয়া যাবে। সেখানে নগরায়ণ গড়ে উঠবে, একই সঙ্গে শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ হবে। শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় রাজধানীর কারখানাকে প্রাধান্য দিলে ঢাকাও যানজটমুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানান তিনি। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে যমুনা সেতু হওয়ার পরই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেকে শিল্প গড়ে তোলেনও। কিন্তুু জ্বালানি সংকটের সমাধানে চলছে ঢিলেঢালা গতি। অথচ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারও রয়েছে। তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা যেতে চাচ্ছেন এটাই বড় কথা। সরকারের উচিত সুযোগটির সদ্ব্যবহার করা। এফবিসিসিআই-এর পরিচালক ও বগুড়া চেম্বার সভাপতি মমতাজউদ্দিন জানান, প্রয়োজনীয় জমি ও বিপুল জনশক্তি থাকায় উদ্যোক্তারা বরাবরই এ অঞ্চলে বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। অনেকে শিল্প স্থাপনও করেছেন। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত বিকাশ সাধিত হয়নি। এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর বলেন, গ্যাস সংযোগ প্রদানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। শিগগিরই উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সংযোগ প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী তার জ্বালানি উপদেষ্টাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় গ্যাস সংযোগ প্রদান করলে সমগ্র উত্তরবঙ্গের রূপ পাল্টে যাবে। পিছিয়ে পড়া উত্তরাঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখতে পারবে নিঃসন্দেহে।