এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন
জীবনের আলো ছড়িয়ে...
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৪, ২০:২৪
দেশের অগ্রগতিতে নানান ভাবে নারী ভূমিকা রাখছে। আর নারীরা এগিয়ে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব শিক্ষার। দিন দিন দেশের নারীর শিক্ষার উন্নতি ঘটছে ব্যাপক। দেশের নারী শিক্ষার বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০০৮ সাল চট্টগ্রাম নগরীর এমএম আলী রোডে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের যাত্রা শুরু হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে আসা প্রতিভাবান নারীদের যথাযথ শিক্ষা প্রদান করার পাশাপাশি নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে ভবিষ্যতের জীবন যাপনের জন্য প্রস্তুত করতে বদ্ধ পরিকর।
মনের উদারতা বৃদ্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট পাঠ্যক্রম, বিশ্বমানের অনুষদ, শিক্ষার্থীর অনুপাত অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক অঙ্গনের শিক্ষার্থীর সমাহার, শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের জন্য এটি অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে বিশ্বের ১৬টি দেশের ৫০১ জন ছাত্রী লেখাপড়া করছেন। ৫০১ জন ছাত্রীর মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছে ২৩৪ জন। বাকি ২৬৭ জনের মধ্যে ভারতের ২৯ জন, মায়ানমারের ৯ জন, ভুটানের ২৫ জন, নেপালের ৪৪ জন, পাকিস্তানের ২৬ জন, আফগানিস্তানের ৪৬ জন, চীনের ৬ জন, কম্বোডিয়ার ৭ জন, ভিয়েতনামের ৩৪ জন, শ্রীলংকার ৩০ জন, ফিলিস্তিনের ৫ জন, কানাডার ১ জন, ইন্দোনেশিয়ার ২ জন, মালয়েশিয়ার ১ জন ও সিরিয়ার ২ জন ছাত্রী রয়েছে।
নারীদের নেতৃত্ব বিনির্মানে বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ গ্রহণ, শ্রীলঙ্কার তামিল ও সিংহলীদের সাথে মৈত্রী স্থাপন, আফগানিস্তানের ছেলে ও মেয়েদের সাথে যৌন নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ সম্পর্কিত বিষয়ে সামগ্রিক আলোচনা, মায়ের সন্তান জন্মদান সংক্রান্ত বিষয়ে সামগ্রিক গবেষণা ও সামপ্রদায়িক স্বাক্ষরতা অনুষ্ঠান এর অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বের অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন পড়ছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আফগানিস্তান থেকে আসা হাকিমা মেহেনা বলেন, আমি সবসময় বাইরের দেশের পড়ার আগ্রহ পোষণ করেছি। মহিলাদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য। যা অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা। তাই আমি অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে পছন্দ করেছি।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে আপন হয়ে উঠেছে ডেচান জানগমো। ভুটানের বংশদ্ভূত এই নারী বলেন, শুরুতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে মিশতে কষ্ট হয়ে উঠেছিল। পরে ধীরে ধীরে সব মানিয়ে নিলাম। এই দেশের সংস্কৃতি অনেক সুন্দর ও মনোরম। যা হয়তো এখানে না আসলেই বুঝতেই পারতাম না।
পরিচয় হয় ভিয়েতনাম থেকে আসা লোয়ান বুইয়ের সঙ্গে। নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। আমাদের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে সবই রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সব কিছু আমরা এখান থেকে পেয়ে থাকি। আমাদের এই ক্যাম্পাসকে বলা যেতে পারে শহরের মধ্যে আরো একটি ছোট্ট শহর।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দানবীরদের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয় বেশ আগে থেকে। বিল গেটস ফাউন্ডেশনসহ আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের দানবীরদের প্রদত্ত দানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। তবে প্রায় ৭০ শতাংশ বাংলাদেশি এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে পড়াশোনা করছে।
লেখাপড়ার বাইরে অবসরে এখানকার শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্লাব নিয়ে। তাদের জন্য রয়েছে পাবলিক হেলথ লিডারশিপ ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব, ডিবেট ক্লাব, মডেল ইউএন অ্যান্ড লিডারশিপ ক্লাব, গিটার ক্লাব ও ড্রামা ক্লাব। ক্রীড়ায় রয়েছে ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবল, টেবিল টেনিস। পাশাপাশি আরো রয়েছে, কারাতে, আর্ট, যোগব্যায়াম। প্রায় বছরজুড়েই চলতে থাকে এসব ক্লাবের কার্যক্রম।
শিক্ষা, উত্সাহ ও ক্ষমতায়ন এই তিনটি প্রতিপাদ্যকে ভিত্তি করে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পথচলা। এই পথচলা নারীর অগ্রগতিকে সামনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। বিশ্বের নারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের নারীরাও এই অগ্রযাত্রার পথে সাথী। বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হোক নারীর ক্ষমতায়ন। জেগে উঠুক নারী শিক্ষার আলোয় উজ্জীবিত হয়ে। উত্সাহ উদ্দীপনায় রাঙ্গিয়ে তুলুক জীবনের ভবিষ্যত্ অধ্যায়গুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ।
উপাচার্য ফাহিমা আজিজ বলেন
এই বিশ্ববিদ্যালয় মূলত নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত। এখানের লেখাপড়ার ধরন সম্পূর্ণ বিশ্বমানের। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানের প্রতিটি শিক্ষার্থী স্বাধীন। এখানে শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি এরা সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ক্ষেত্রেও এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বর্তমানে ছোট হলেও আমরা অতি শীঘ্রই নতুন ক্যম্পাসে যাবো। তখন হয়তো এর প্রসার আরো বৃদ্ধি পাবে। নারী শিক্ষার এই অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের প্রত্যয়।