শি ক্ষা র আ লো

পথশিশুদের পড়াশোনা

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে মা স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে দিবে আর বাবা স্কুলে রেখে আসবে। একজন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর দিনের শুরুটা এ রকমই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ে নিজের মেধাকে বিকাশের পাশাপাশি নিজেকে তৈরি করবে আগামি দিনের জন্য। একটি শিশু হাসবে খেলবে, তার সঙ্গে সে বিভিন্ন বিষয় শিখবে এটাই শিশুর মধ্যে লুকায়িত প্রতিভা বিকাশের প্রকৃত পথ। কিন্তু যাদের জীবনে দিনের শুরু হয় সারা দিন কী খাবে তার হিসেব কষতে সেই পথশিশুদের কাছে এ পথটি যেন পুরোটাই দুর্গম ও অচেনা । জীবন-জীবিকার কাছে যখন জীবনের মূল্যই অর্থহীন তখন শিক্ষার মাধ্যমে মেধা বিকাশ যেন এক অলীক কল্পনা বিলাস। প্রায় সবক্ষেত্রেই দারিদ্র্য তাদের ঠেলে দেয় অকালে কর্মময় জীবনে। নিজেদের জীবিকা তারা নিজেরাই নির্বাহ করে। কখনও কখনও পরিবারের ব্যয়ভারও তাদেরই বহন করতে হয়। দিনরাত কাজ করার পর লেখাপড়ার চিন্তা প্রায় অসম্ভব। মৌলিক অধিকার শিক্ষা যে তাদের কাছে এক ঐচ্ছিক বিষয়। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও পথশিশুদের শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিদিনই চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে ফুল বিক্রি করে থাকে বিভিন্ন সুবিধা বঞ্চিত শিশু। এ দিয়েই চলে তাদের পরিবার। এরকমই এক ফুল বিক্রেতা ফাতেমা আকাতর জানায়, প্রতিদিন সে ১৫০-২০০ টাকার ফুল বিক্রি করে। ভোর থেকে শুরু প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত ফুল বিক্রি করে। এর ফাঁকেই সে সময় পেলে চন্দ্রিমা উদ্যানে মাঝে মাঝে পড়তে যায়। কিন্তু এতো পরিশ্রমের পর তার আর পড়তে খুব ইচ্ছা করে না। তাই সে পড়তেও যায় না। এদিকে পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছায় কাজের ফাঁকেও সময় বের করার চেষ্টা করে ফার্মগেইট এলাকার চা বিক্রেতা নাহিদ। সে তার গ্রামে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। সর্বনাশা বন্যা আর অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসে নিজেই রোজগারের পথ বেছে নিয়েছে। সে জানায়, আমার পড়ালেখার খুব ইচ্ছা। আমি এখনে একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু সারাদিন কাজ করতে হয় তাই প্রতিদিন স্কুলে যেতে পারি না। ফলে নিয়মিত পড়তেও পারি না। শিক্ষা কেন্দ্রে লেখাপড়া শিখতে আসা রবি (৮) জানায়, তার বাবা অসুস্থ্, মা মারা গেছে তিন বছর আগে। স্থানীয় ঠিকাদারের পরিত্যক্ত বারান্দায় ঠাঁই নিয়েছে তাদের পরিবার। আরেক শিক্ষার্থী বাবলি (৯) জানায়, তার বাবা নেই। নানি ষ্টেশনে ভিক্ষা করে তাদের দুই ভাইবোনের আহার জোগাড় করেন। তারা সারাদিন শহরে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল কুড়ায়। নিয়মিত পড়াশোনার মাধ্যমে নিজেদেরকে অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে চায় তারা। রায়ের বাজার বস্তিতে থেকে কাজের মাঝে মাঝে একটি স্কুলেও পড়তে যায় ১১ বছরের শাহিদা। মা জাহানারা খাতুনের কাছে তার লেখাপড়ার খবর জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমগো দুইবেলাই খাওয়া জোটে না আর পড়ামু ক্যামনে। হ্যার বাপেও চায়না কাজ-কাম বাদ দিয়ে লেহাপড়া করুক। তার পরও হ্যায় মাজে মধ্যে ইস্কুলে যায়। লেহাপড়া করতে পারলে তো ভালোই হতো।’ রাজধানীতে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে থাকেন বেশ কয়েকজন তরুণ। তাদের মধ্যে মশিউর রহমান জানান, ‘এখন আমরা নিজেদের উদ্যোগে বাচ্চাদের পড়িয়ে থাকি। বাচ্চাদের পড়াতে বেশ ভাল লাগে এবং মনটাও ভাল থাকে। সামনের দিনগুলাতে আমরা আরো বেশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করতে পারি সে লক্ষ্যে কাজ করে যাব।’ তিনি জানান, ‘সপ্তাহে পাঁচ দিন সন্ধ্যার পরে পড়িয়ে থাকি। সুবিধাবঞ্চিত এ শিশুদের সংখ্যা প্রায় ৬৫। যাদের বেশির ভাগের বয়স ৬-৯ এর মধ্যে। প্রতিদিন শিশুরা আনন্দের সঙ্গেই এখানে পড়তে আসে। তারা পড়ার পাশাপাশি নাচ, গান, আবৃত্তিও শেখে।’ সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর কয়েকজন উদ্যোক্তার মধ্যে রয়েছেন এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুলতানা তাবাচ্ছুম। এসব শিশুদের পড়ানো অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘সত্যি কথা বলতে এ কাজটি যতটাই মহত্ ঠিক ততটাই কঠিন কাজ। এসব শিশুদের অবিভাবকরা পড়াশোনায় না পাঠিয়ে কাজে পাঠায়। ফলে তাদের কাছে পড়ালেখার গুরুত্ব বুঝিয়ে স্কুলে নিয়ে আসাটা খুবই কঠিন কাজ। তাছাড়া তাদের ধরে রাখাও কঠিন।’