লোকসভা নির্বাচন শুরুতেই হোঁচট খেলেন মমতা
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৫
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নয় বরং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা নিয়েই এগোতে চেয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। তার রাজ্যের মানুষও অন্য যে কারো চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসনে তাকেই দেখতে আগ্রহী। তাইতো আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রচারণা একটু জোরেসোরেই শুরু করতে চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ‘দিদি’। তার ইচ্ছা ছিল জাতীয় পর্যায়ে অভিষেকটা একটু সাড়া জাগিয়ে করা। কিন্তু তা আর হলো না। দিল্লি¬র রামলীলা ময়দানের জনসমাবেশে পাশে পেলেন না দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী গান্ধীবাদী সমাজকর্মী আন্না হাজারেকে। যে কারণে শুরুতেই বড় হোঁচট খেলেন তিনি। যদি আন্না আসতেন তাহলে রাজ্যের বাইরে নিজের অবস্থান ও শক্তির জানান দিতে পারতেন মমতা।
আন্না না আসায় অনেক কষ্টই পেয়েছেন মমতা। তাইতো গুজরাটের আহমেদাবাদে আন্নাকে সঙ্গে নিয়ে যৌথসভার পরিকল্পনা আপাতত বাতিল করেছেন। ভবিষ্যতে আন্নার সঙ্গে মমতার এই যৌথসভা হওয়ার সম্ভাবনাও কম। অথচ গত কয়েকদিন ধরে প্রচার করা হয়েছিল মমতার জনসভায় আন্না হাজারে বক্তব্য দেবেন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আন্না না আসলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মমতার দলকে সমর্থন দেয়া নিয়ে টিম আন্নার সমর্থকদের মতবিরোধের কারণেই তিনি জনসভায় আসেননি। যদিও মমতার পক্ষ থেকে তাকে ময়দানে আনার জোর চেষ্টাও ছিলো। তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মুকুল রায়কেও পাঠানো হয়েছিল তাকে আনার জন্য। কিন্তু আন্নাকে
রাজি করাতে পারেননি তিনিও। যে কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তৃণমূলের দিল্লি কার্যালয় থেকে আন্নার ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
মমতা ক্ষেপার পর শুক্রবার আন্না জানিয়েছেন, রামলীলা ময়দানে উপস্থিতি কম থাকার কারণে তিনি যাননি। তিনি বলেন, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের ওপর তার সমর্থন নেই। তবে তিনি মমতা ব্যানার্জীকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করেন। তার মতে, মমতা হলেন ভারতের সেরা মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে আন্না কাউকে সমর্থন করবেন না বলেও জানিয়েছেন। এদিকে, তার অনুপস্থিতিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন মমতা। যদিও নিজেই বক্তব্যের মাধ্যমে সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। মমতা বলেন, কে তৃণমূলকে সমর্থন করলো, কে করলো না সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। তৃণমূল তার লড়াই চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, এ সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য আমি অনেক কাজ ফেলে এসেছি। এটি ছিলো একটি সামাজিক সমাবেশ, কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়। এ কারণে আন্না হাজারেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। আমরা এ সমাবেশে শক্তির প্রদর্শন করতে চাইনি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা আমার ইচ্ছা নয়। আমি ব্যক্তির নয় জনগণের ক্ষমতা চাই।
জাতীয় পর্যায়ে অভিষেকটা চাওয়া অনুযায়ী না হওয়ায় দিল্লি থেকে ফিরে পশ্চিমবঙ্গেই নজর দিলেন তিনি। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসতে গেলে এই পশ্চিমবঙ্গ থেকেই তাঁকে বেশি আসনে জিততে হবে। দিল্লি থেকে ফিরে কলকাতা বিমানবন্দরে তাই তিনি বলেন, ভারতে এখন দুটি বড় রাজনৈতিক দল রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা লড়ছে। এবার তৃণমূল দেশের তৃতীয় বড় দল হিসেবে উঠে আসবে। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি এখন জেলায় জেলায় সফর করবেন। পাশাপাশি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবেন ত্রিপুরা, ঝাড়খন্ড, সিকিমের মতো প্রতিবেশী রাজ্যে। শুধু লোকসভা নির্বাচন নয়, ভবিষ্যতে ওই রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনের দিকেও মমতার বিশেষ নজর রয়েছে। কিন্তু কিছু বিষয় মমতাকে বোঝা উচিত ছিলো। ইতিমধ্যে হাজারের ভাবশীষ্য অরবিন্দ কেজরিয়াল দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের পুরো সুবিধা নিয়েছেন। দিল্লিতে রাজ্য সরকারও গঠন করেছিলেন। অনেকেই বলছেন, লোকসভার নির্বাচনে সুবিধা নিতেই রাজ্য সরকার ভেঙে দিয়েছেন কেজরিওয়াল। তাহলে এ অবস্থায় কেন আন্নার সঙ্গে জোট করতে চেয়েছিলেন মমতা? কীভাবে তিনি চিন্তা করেছিলেন, আন্না সঙ্গে থাকলে দিল্লিতে তিনি জনসমর্থন পাবেন। এ পর্যায়ে জোট করার জন্য মমতার আরো একটু সচেতন হওয়া উচিত ছিলো। বিশেষ করে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সঙ্গে জোটে যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার তার।
একটা বিষয় নিশ্চিত মমতা আসন্ন নির্বাচনের পর সরকার গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। কারণ জনমত জরিপগুলো বলছে, এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হবে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। দিল্লিতে একটি ব্যর্থ জনসভার পর তিনি তার গুরুত্ব নিজেই কমিয়ে ফেলেছেন। এছাড়া তার রাজ্যে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন সেটাও সবক্ষেত্রে সত্য নয়। শিশু মৃত্যুহার, নারীর উপর নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। সারদার মতো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক জালিয়াতির ঘটনাও তার সরকারের সময়ে ঘটেছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক কল্যাণে আরো প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। রাজ্যের উন্নয়ন এবং সুসংহত অবস্থায় জাতীয় পর্যায়ে তার ভূমিকা রাখার পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেবে। এখন অন্য রাজ্যে জনসমাবেশ করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। এসব জনসভায় তিনি আরো বিশ্বস্ত দল ও লোককে পাবেন এমনটাই সবার আশা।