লালনের গানে মুখরিত ছেঁউড়িয়া

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়িতে শনিবার শুরু হয়েছে পাঁচদিনব্যাপী লালন দোল উত্সব। এবার উত্সবের শিরোনাম ঃ ‘পারে লয়ে যাও আমায়’। ফকির লালন সাঁই ছেঁউড়িয়ায় ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে দোল উত্সব পালন করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় সাঁইজির তিরোধানের পর ভক্ত-শিষ্যরা প্রতিবছর ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে দোল উত্সব উদযাপন করে আসছেন। উত্সব উপলক্ষে ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি এখন কানায় কানায় পূর্ণ সাধু-ভক্তদের পদচারণায়। এবার অনেকেই কয়েকদিন আগেই এসেছেন এখানে। সেকারণে সফেদ লুঙ্গি, পাঞ্জাবি আর শুভ্র শাড়ি পরিহিত হাজারো ভক্তের সমাগমে ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ির চারপাশ শুধু সাদা আর সাদা। আখড়াবাড়ির মূল আঙিনা ও কালীগঙ্গা নদীর তীরে ‘ভবের হাটে’ বসে ভজন-সাধনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আগত বাউল ভক্ত-সাধুরা। হাতে একতারা, দোতারা, খঞ্জনী, তবলা আর হারমোনিয়াম নিয়ে গলা ছেড়ে গাইছেন- পারে লয়ে যাও আমায়/, সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা/, আমি অপার হয়ে বসে আছি/, সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/, জাত গেলো জাত গেলো বলে/, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়/, আপন ঘরের খবর লে না/, আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী/, মন তুই করলি একি ইতরপনা/, এই মানুষে সেই মানুষ আছে/, যেখানে সাঁইর বারামখানা/, বাড়ির কাছে আরশীনগর সেথা একঘর পড়শী বসত করে/, মিলন হবে কতদিনে-ইত্যাদি কালজয়ী গান। গানশেষে সাধু-গুরুরা তাদের শিষ্য-ভক্তদের গানের মর্মকথা ব্যাখ্যা করে শোনাচ্ছেন। খণ্ড-খণ্ড স্থানে গান পরিবেশনের সময় দর্শক-জনতাও নেচে-গেয়ে তাল মিলাচ্ছেন। কলকাতা থেকে আসা দেবাশীষ ফকির বলেন, আমিতো সাঁইজির লিখা গানের পাগল। প্রতিবছর দোল উত্সবে ছেঁউড়িয়ায় আসি। তিনি বলেন, ফকির লালন সাঁইজির একজন গুরুর কথা আমরা জানি। তিনি হলেন সিরাজ সাঁই। সিরাজ সাঁই ছাড়াও সাঁইজির আরও তিনজন গুরু ছিলেন। বাউল শরফুদ্দিন শাহ বলেন, জানতে হলে সাঁইজিকে গুপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বাউল ফিরোজ ফকির জানান, দিন-ক্ষণ প্রতি বছর বাবার টানে আখড়ায় আসি। এখানে না গাইলে নিজের শিল্পীমনের তৃপ্তি মেটে না। লালন একাডেমীর আয়োজনে লালনের মূল মাজারের সামনে মরাকালী নদীর তীরে বসেছে লালন মেলা। এতে স্থান পেয়েছে কুটির শিল্পজাত নানা সামগ্রী, লালনের প্রতিকৃতি, একতারা, গলার মালা, হস্ত শিল্প পণ্যসহ হরেক রকম জিনিসপত্র। এছাড়া বিশাল প্যান্ডেলসহ ‘লালন মঞ্চে’ প্রতিদিন প্রথম পর্বে আলোচনা ও দ্বিতীয়পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাউল শিল্পীদের সমন্বয়ে লালন সঙ্গীত। এই মঞ্চে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে গানবাজনা।