আরও একবার রানার জন্য জয়!
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৯
বাইরে তখনও দর্শকের ভিড়। গ্যালারিতে সবাই এসে পৌঁছাতে পারেননি। যারা পৌঁছেছেন, তারাও কেবল গোছগাছ করে নিচ্ছেন। মাশরাফি বিন মুর্তজা ছুটে এলেন এবারের ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির প্রথম বলটি করার জন্য। প্রথম বলেই টি-টোয়েন্টির মতো করে চালালেন আফগান ওপেনার মোহাম্মদ শাহাজাদ। কিন্তু শাহাজাদের আশা পূর্ণ হলো না; কাভারে অসাধারণ এক ক্যাচ নিয়ে নিলেন মাহমুদউল্লাহ।
হাত শূন্যে তুলে চিরচেনা ভঙ্গিতে বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়লেন মাশরাফি। তারপর ওপরের দিকে চেয়ে কী যেন দেখলেন। রানাকে খুঁজলেন মাশরাফি?
হ্যাঁ, মানজারুল ইসলাম রানা! গতকাল ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে আবেগের-কষ্টের নাম, সেই রানার মৃত্যুবার্ষিকী। আর সেই দিনটাতেই আরও একবার গর্জে উঠলেন রানার প্রিয় বন্ধু মাশরাফি, রাজ্জাক এবং প্রিয় ছোট ভাই সাকিব আল হাসানরা। ফল, আরও একটি ‘রানার জন্য ম্যাচ’-এ বাংলাদেশের জয়!
এই ব্যাখ্যাতীত ঘটনার শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে।
সেবারের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ছিল ১৭ মার্চ। ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচ নিয়ে তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে বাংলাদেশ; সব জায়গায় উত্তেজনা। ঠিক সেই সময় খুলনা থেকে আসা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ সংবাদ কেঁপে উঠলো বিশ্ব—দেশের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার মানজারুল ইসলাম রানা আর নেই। ২০০৭ সালের ঠিক আজকের দিনে আরেক জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটার সাজ্জাদুল ইসলাম সেতুর সঙ্গে একই মোটর সাইকেলের দুর্ঘটনায় ক্রিকেটের এই চেনা দুনিয়া ছেড়ে চলে যান রানা।
রানা শুধু জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার ছিলেন, এটা বলে কিচ্ছু বোঝা যাবে না। তার ৬ টেস্ট ও ২৫ ওয়ানডের পরিসংখ্যান দিয়েও কিচ্ছু বোঝা যাবে না তার সম্পর্কে। রানা ছিলেন আসলে তখনকার জাতীয় দলটার প্রাণ। সৈয়দ রাসেল, মাশরাফি বিন মুর্তজা, আব্দুর রাজ্জাকদের হূদয়ের বন্ধন। এই বন্ধুর সঙ্গেই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আড্ডা-খেলায় বড় হয়ে উঠেছেন তারা।
৬ টেস্টে ২৫৭ রান ও ৫ উইকেট এবং ২৫ ওয়ানডেতে ৩৩১ রান ও ২৩ উইকেট নেয়া রানা অনায়াসে সেই বিশ্বকাপের দলেও থাকতে পারতেন। সেটা হয়নি হয়তো নানা কারণে। কিন্তু মাশরাফিরা যখন শুনলেন দেশে রেখে আসা সেই বন্ধুই মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় তাদের ছেড়ে চলে গেছেন, আক্ষরিক অর্থেই তাদের দুনিয়া টলে উঠেছিল।
মাশরাফির সেদিন শরীরে ভয়ঙ্কর জ্বর। সেই জ্বর নিয়েই মাশরাফি বলেছিলেন, ‘আজ রানার জন্য খেলবো, রানার জন্য জিতবো।’
তারপর তো ইতিহাস। সেই ভারতকে বন্ধু রানার জন্য ঠিকই ‘ধরে দিয়েছিলেন’ মাশরাফিরা।
বিস্ময়করভাবে এরপর প্রায় প্রতিবছরই রানার মৃত্যুর এই দিনটার আশেপাশে বাংলাদেশ কোনো দলের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে এবং জিতেছে! আর প্রায় প্রতিবারই আবার সেই ম্যাচের নায়ক হয়েছেন কোনো না কোনোভাবে রানার ভাইতুল্য সেই বন্ধু মাশরাফি।
রানার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দু’দিন পর, ১৮ মার্চ এই ঢাকায় বাংলাদেশ হারিয়েছিলো আয়ারল্যান্ডকে; মাশরাফি ২২ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন। ২০০৯ ও ২০১০ সালে মার্চ মাসে বাংলাদেশের খেলা ছিল না। ২০১১ সালের ১১ মার্চ ইংল্যান্ড ও ১৪ মার্চ নেদারল্যান্ডসকে হারায় বাংলাদেশ।
আর ২০১২ সালে ঠিক রানার মৃত্যুবার্ষিকীর দিন, এই ১৬ মার্চ ঢাকায় ছিল এশিয়া কাপে বাংলাদেশের ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। আবার ম্যাচের আগের রাতে মাশরাফি সতীর্থদের বলেছিলেন, ‘চল, রানার জন্য খেলি।’ এবারও ফলটা নিশ্চয়ই মনে আছে!