স্মরণীয় বরণীয়

আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু প্রখ্যাত পদার্থ ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানী

ছোটবেলায় গাঁয়ের মাঠে ঘুরতাম। আর লজ্জাবতীর গাছ দেখলেই ছড়ানো পাতাগুলো ছুঁয়ে দিতাম। পাতাগুলো আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যেতো। কী যে মজা পেতাম ! অপূর্ব সে অনুভূতি। গাছেরও যে প্রাণ আছে, অনুভূতি আছে — তখন হয়তো অত সব বুঝতাম না। কেবলি মজা পেতাম বলেই লজ্জাবতীর লতার সাথে চলতো লজ্জা দেয়ার খেলা। এই বাংলাদেশেরই এক শিশু বড় হয়ে প্রমাণ করলেন “গাছেরও জীবন আছে, অনুভূতি আছে।” মুন্সিগঞ্জের রাঢ়িখাল গ্রামে ৩০ নভেম্বর ১৮৫৮ সালের কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল — সেদিন শিশুটি আর দশটি গ্রামের শিশুর মতোই হেসে খেলে, নেচে-গেয়ে বাড়তে থাকে। সেই গ্রামের, এমনকি আমাদের দেশও ভাবতে পারেনি এই শিশুই একদিন আন্ত্মর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিজ্ঞানী হবেন। শিশু বয়স থেকেই প্রতিটি বিষয়ে ছিল জানবার উদগ্র ইচ্ছা। এই কৌতূহল তাঁকে ক্রমাগত আবিষ্কারের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। শিশুটির নাম জগদীশ চন্দ্র বসু। পিতা র্িছলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ফরিদপুরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কলকাতার প্রথমে হেয়ার স্কুল এবং পরে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে অধ্যয়ন করেন। এই স্কুল থেকে এন্ট্রাস এবং বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর লন্ডনে একবছর চিকিত্সা শাস্ত্রে অধ্যয়ন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিত্সা শাস্ত্র ছেড়ে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে বিজ্ঞানে অনার্স সহ (পর্দাথ, রসায়ন এবং উদ্ভিদ বিজ্ঞান) বিএ পাস করেন (১৮৮৪)। একই বছর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর দেশে আসেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা শুরম্ন। অধ্যাপনার ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়ে গভীর মনোনিবেশ করেন। এক সময় ‘বেতার বার্তার সূত্র’ আবিষ্কার করে ফেলেন। তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্রটির নাম ‘ক্রিস্ট্যাল রিসিভার’। প্রায় এক মাইল দূরে এই যন্ত্রের সাহায্যে সাংকেতিক শব্দ প্রেরণ করা যেত। তিনি এই তত্ত্ব প্রমাণ করেন যে, অদৃশ্য আলোকেও দৃশ্য আলোকের সকল ধর্ম বর্তমান। এছাড়া তিনি জৈব এবং অজৈব পদার্থের উত্তেজনার ফলে সাড়ার সমতা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি উদ্ভিদের উপর প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উত্তেজনার ফলাফল সম্পর্কে গবেষণা করেন। এসব গবেষণার জন্য স্বউদ্ভাবিত যন্ত্র যেমন: স্ফিগমোগ্রাফ, পোটোমিটার ও ফোটোসিনথেটিক বাবলার প্রভৃতি আবিষ্কার করেন। তিনি প্রমাণ করেন উদ্ভিদেরও জীবন বা অনুভূতি আছে। অধ্যাপনা শেষে ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (১৯১৭) প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষনা করেছেন এবং মৌলিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন “বিজ্ঞান বিষয়ক” প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন। তাঁর অধ্যয়ন, গবেষণা এবং আবিষ্কারের জন্য বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁকে সি.আই.ই (১৯০৩), সি.এস.আই (১৯১২), নাইটহুড (১৯১৭) উপাধি প্রদান করা হয়েছে। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে পথিকৃত্। তাঁর বিজ্ঞান বিষিয়ক প্রবন্ধ গুলো ‘অব্যক্ত’ নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এছাড়া ইংরেজি রচনার সংখ্যাও কম নয়। ২৩ নভেম্বর ১৯৩৭ বিহারের গিরিডি-তে তাঁর প্রয়াণ ঘটে।