অর্থনীতির বিস্ময় অসংগঠিত খাত
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৪, ২২:৫২
সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতি বার বার আঘাত হানে দেশের অর্থনীতিতে। যৌক্তিক কারণেই উদ্বেগ দেখা দেয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে। নানা মহল থেকে তখন দাবি ওঠে বিপন্ন অর্থনীতিকে বাঁচানোর। এতসব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে ৬ শতাংশের মত প্রবৃদ্ধি অর্জন অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ‘মিরাক্যল’ বলে অভিহিত করেছে।
শুনলে অবাক হতে হয় বৈকি- অর্থনীতির এই প্রশংসনীয় উন্নতির পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা বেসরকারি অসংগঠিত খাত। যেখানে একেবারের শূন্য কিংবা স্বল্প পুঁজি দিয়ে জীবিকা অর্জনের পথে নিজের অজান্তেই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখছেন প্রান্তিক শ্রেণির অসংখ্য নর-নারী।
দুটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। ঢাকার তেজগাঁওয়ে মায়ের দোয়া ক্যান্ডেল ওয়ার্কস। এখানে মোমবাতি তৈরির কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা। দিনভর খাটুনি তাদের, দিনশেষে মজুরি দিয়ে পেট ভরে দুমুঠো খাওয়া। কিন্তু অজান্তেই তারা অবদান রেখে চলেছেন অর্থনীতিতে। একই রকম অবদান রাখছেন এর উদ্যোক্তা।
যশোরের কেশবপুরের সাতবাড়িয়া গ্রাম। এই গ্রামের মোমেনা বেগমের রয়েছে বোতাম তৈরির কারখানা। বাজারে বোতাম সরবরাহ করে মাসে আয় করেন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তিনি ঢাকা থেকে কোরিয়ান প্লাস্টিক দানা কিনে নিয়ে যান কাঁচামাল হিসাবে। এক পাউন্ড প্লাস্টিক দানায় তৈরি হয় ১ হাজার ৭২৮টি বোতাম। এর উত্পাদন খরচ হয় মাত্র ৫৫ টাকা। বিক্রি হয় ৮৫ টাকায়।
সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এ রকম লক্ষাধিক উদ্যোগ রয়েছে দেশে। যেগুলোর সঠিক হিসাব নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই গড়ে উঠেছে এসব অর্থনৈতিক কার্যক্রম। অনেকটা নিরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে এই প্রান্তিক উদ্যোক্তা। অনানুষ্ঠানিক এসব খাতে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বিপুলসংখ্যক বেকার নর-নারীর।
অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে স্বকর্মসংস্থানের এই উদ্যোগগুলো অর্থনীতিতে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারতো। তিনি বলেন, অসংগঠিত হওয়ায় এইসব খাতের হিসাব জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। অথচ হাটেঘাটে সহজেই চোখে পড়ে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও উত্পাদিত পণ্য। বাঁশ ও বেতের নানা রকম দৃষ্টিনন্দন আসবাবপত্র, মৃিশল্প, ছোটছোট ওয়ার্কশপ, ক্ষুদ্র বুটিক হাউস, সেলাই ঘর, মাছ চাষ প্রকল্প প্রভৃতি খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা দিনভর কাজ করছেন। ছোটখাটো খাবার দোকানগুলোতেও রয়েছে মানুষের ভিড়। আপাত ক্ষুদ্র উদ্যোগ মনে হলেও এগুলো সবসময়েই সচল থাকছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বেকারত্ব, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য ইত্যাদি কারণে নিম্নআয়ের লোকদের ত্রাহি ত্রাহি দশা। এরমধ্যে এ ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বিপুলসংখ্যক নর-নারীর উপার্জনের পথ খুলে দেয়ার পাশাপাশি গোটা অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।