স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক যাঁরা

হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালি এ বছরের ষোল ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জন করেছে অধীনতা থেকে, পরাজিত করেছে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের ও এদেশীয় দালালদের। পাক সৈন্যের সেই পরাজয় আজও চোখের সামনে ভাসছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও আহ্বানে জেগে উঠল সমগ্র বাঙালি জাতি। তিনিই স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়ক। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে শুরু হলো স্বাধীনতাকামী বাঙালির সশস্ত্র সংগ্রাম, প্রতিরোধ ও মহান মুক্তিযুদ্ধ। ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, জেলে, কামার-কুমোর, রাজনীতিক, চিকিত্সক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক তথা স্বাধীনতাকামী বাঙালি এই যুদ্ধে অংশ নিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত বাঙালি সৈনিকেরাও বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন। অবসরপ্রাপ্ত দুই বাঙালি কর্নেল আতাউল গনি ওসমানি, মো. আবদুর রব এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার দায়িত্ব পেলেন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার। আতাউল গনি ওসমানি ও মো. আব্দুর রব ছিলেন তখন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। আর মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলোর অধিনায়কের দায়িত্ব পেলেন তত্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর এটিএম হায়দার, মেজর নূরুজ্জামান, মেজর সিআর দত্ত, মেজর মীর শওকত আলী, উইং কমান্ডার কে.এম. বাশার, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর এম এ মনজুর, মেজর এম এ জলিল, মেজর আবু সালেক চৌধুরী, মেজর আবু তাহের ও ফ্লা. লে. এম হামিদুল্লাহ। পুরো ন’টি মাস যুদ্ধ হয়েছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। প্রায় এক লক্ষ মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হয়েছিল ভারতে। শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাদ্য এবং আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে সাহায্য করেছিলো পরম বন্ধু ভারত। পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল দানবের চেয়েও খারাপ। এদেশীয় দালাল সৃষ্টি করেছিল আর নারী, শিশু-কিশোর নির্বিশেষে হত্যা করেছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের। একজন নয়, দু’জন নয়, ত্রিশ লক্ষ বাঙালি। তাইতো আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি গ্রামে একাত্তরের স্মৃতিসৌধ মাথা উঁচু করে গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের অন্তরের ঘৃণা ও ধিক্কার আজও উচ্চকিত। স্বাধীনতা শত্রুদের আজও আমরা ভুলিনি। আর ভুলিনি স্বদেশের জন্য প্রাণপ্রিয়, বীর সন্তানদের। মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রাণ উত্সর্গ করেছেন ত্রিশলক্ষ মানুষ। এদের মধ্যে পুলিশ, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, আনসার মুজাহিদ, ছাত্র, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শ্রমিক, কৃষক, রাজনীতিক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী তথা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ রয়েছেন। এদের রক্তের বিনিময়েই আমরা আজ স্বাধীনতা ভোগ করছি। আমাদের এই যে পতাকা, এই যে মানচিত্র ও স্বরাজ, তা কিন্তু ত্রিশলক্ষ মানুষের তাজা রক্তেরই দান। এ রক্তের পতাকা যতোদিন বাংলাদেশে উড়বে, বাঙালি থাকবে, ততোদিন ঋণী হয়ে থাকতে হবে। এ ঋণ অপরিশোধ্য। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর, মুক্তিযুদ্ধে যারা বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, আত্ম উত্সর্গ করেছেন এবং বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন, তাদের জাতির পক্ষ থেকে আলাদাভাবে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হয়। বলা হয়, ‘মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’। বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণ এবং তাদের স্মৃতি ও স্মরণে নির্মাণ করা হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও অপরাপর স্মৃতিসৌধ এবং ভাস্কর্য। এ ক্ষেত্রে বেশকিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের নানা উপাধি দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়। উপাধিগুলো হলো— বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীর প্রতীক। এই উপাধিগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অমর প্রতীক। তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারই এগুলো প্রদান করেন। আর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ বিলিয়ে দেন। এঁরা হলেন— ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, ক্যাপটেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, সিপাহী হামিদুর রহমান, নায়েক মুনশী আবদুর রউফ, ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, সিপাহী হামিদুর রহমান ও স্কোয়ার্ডেন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। বীরউত্তম উপাধি পেয়েছিলেন ৬৮ জন, বীর বিক্রম পেয়েছিলেন ১৭৫ জন এবং বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন ৪২৬ জন। মুক্তিযুদ্ধে এঁদের আত্মত্যাগ জাতি কখনো ভুলবে না এবং তাদের ঋণ কোন কিছু দিয়ে শোধ করা যাবে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি যে সকল বন্ধুরা সহায়তা করেছে তাদের কাছে আমরা ঋণী। তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের উপাধি ও সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পূর্ণ করে আমরা ৪৩ বছরে পা দিলাম। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক বীরসেনানী মৃত্যুবরণ করেছেন। হয়তো একদিন স্বাভাবিক কারণেই আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা মারা যাবেন। কিন্তু তাদের দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগের কাহিনী চিরকাল বাংলার মানুষ মনে করবে। তাদের রক্তের বিনিময়েই এদেশের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। তাঁরা বেঁচে থাকবেন হূদয়ে এবং তাদের স্মৃতি-শ্রদ্ধায় গড়া বিভিন্ন প্রামাণ্য স্থাপনা ও নির্দেশনা স্মারকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিকেরা বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান, অমর রহে তাঁরা।