শেকড়ের খোঁজে একাত্তরের ইমন

ছোট্ট ইমন যখন আশ্রয় কেন্দ্রে তখনও সে বুঝতে পারেনি সে কে। কি তার পরিচয়। বুঝতে পারেনি কে তার মা। কে তার বাবা। কিন্তু আশ্রয় কেন্দ্রে তাকে বেশিদিন থাকতে হয়নি। কারণ আশ্রয় কেন্দ্রে চাকরি করা বিদেশি এক নাগরিক তাকে নিয়ে পাড়ি দেন নেদারল্যান্ডে। সেখানে মানব দরদী এক বিদেশি নাগরিক রবার্ট-এর কাছে তাকে তুলে দেয়া হয়। ইমন জানতো তিনিই তার বাবা-মা সবকিছু। রবার্ট ছিলেন একটা এনজিওর সাথে যুক্ত। তিনি ইমনকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলেন। ইমনের বয়স যখন ৩৫ বছর তখন ওই দেশের অনেক বড় এনজিও-র কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। একটা সময় জানতে পারেন রবার্ট তার কেউ নন। একজন পালক পিতা। ইমন চাকরির সুবাদে বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। ইতিহাস ঘাটাঘাটি করে জানতে পারেন তিনি একজন যুদ্ধশিশু। ছোট বেলা থেকেই এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত। তখন এর মানে বুঝতেন না। কিন্তু আজ তার মানে খুব সহজেই বুঝতে পারলেন। জানলেন তিনি একজন বাংলাদেশি। তার জন্ম বাংলাদেশে। লাঞ্ছিত এক বাংলা মায়ের সন্তান। আমাদের এই দেশ একটি স্বাধীন দেশ। কিন্তু এই স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। অনেক মানুষের রক্ত ঝরিয়ে, অনেক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পরে এই দেশ স্বাধীন হয়। আর ইমন এদেরই একজনের সন্তান। এসব জেনে ইমন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবুও গর্বে তার বুকটা ভরে গেলো। কিন্তু দুঃখ একটাই, তিনি তার মাকে দেখেননি। কোন নারী তার মা ছিলেন। কে ছিলেন । তিনি কোথায় কোন অবস্থায় আছেন। আজো কি তিনি বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকলেও কেমন আছেন। এসব ভেবে ভেবে ইমন অস্থির হয়ে পড়েন। ইমন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বাংলাদেশে যাবেন। যোগাযোগ করলেন বাংলাদেশে। যে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বিদেশে এসেছিলেন সেখানকার সব তথ্য সংগ্রহ করলেন। কিন্তু বুঝতে পারলেন বিদেশে থেকে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। তাকে নিজ চোখে সব দেখে আসতে হবে। জানতে হবে সব। খুঁজতে হবে তার মাকে। নয়তো জীবনে বেঁচে থাকাই বৃথা হবে। এমন একটা দেশে তার জন্ম যার নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় বুক ভরে ওঠে। যেখানে তার মায়ের জন্ম। তার জন্ম। তাই তিনি আর পিছনে না তাকিয়ে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। একবার দেশের মাটি ছুঁয়ে আসবেনই। সব ঠিকঠাক। দেশের মাটিতে পা রাখলেন ইমন। দেশের মাটি ছুঁয়ে সালাম করে মাটি বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চশমা খুলে চোখ মুছলেন। দেশের আলো বাতাস অনুভব করলেন। বুক ভরে নিশ্বাস নিলেন। দেরি না করে ইমন আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে রওনা দিলেন। দুঃখের বিষয় আশ্রয় কেন্দ্রের প্রধান কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। কিন্তু তবুও ইমন হাল ছাড়েননি তার মাকে খোঁজার। ইমন পুরো আশ্রয় কেন্দ্রটি ঘুরে দেখলেন। এখানে অনেক অনাথ শিশু রয়েছে। ইমন সব মহিলার মধ্যে তার মাকে খুঁজে বেড়ালেন। কিন্তু পেলেন না। কে তার মা? কি তার পরিচয়? ইমন ভাবে কখনোই কি তার মাকে খুঁজে পাবেন না? তার পরিবারের কারো দেখা কি পাবেন না? ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে পড়েন। ইমন নিজেকে সামলে নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বললেন। ইমন অনাথ শিশু ও নির্যাতিত মহিলাদের নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নিলেন। ইমন বেঁচে থাকা এক একাত্তরের মায়ের কাছ থেকে ইতিহাসের সেই নির্মম নিষ্ঠুর কাহিনী শুনলেন। ইমন বিদেশের মাটিতে বড় হওয়ায় বাংলা ভাষা বোঝা তার পক্ষে কঠিন ছিল। তার সাথে বিদেশ থেকে যে গাইড এসেছিলেন তিনিও তেমন একটা বাংলায় পারদর্শী ছিলেন না। তাই আশ্রয় কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালক ইমনের জন্য একজন দোভাষী নিয়োগ দিলেন। ইমন তার সাহায্যে পুরো বাংলাদেশ ট্যুর করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইমন বাংলাদেশে থেকেই এদেশের আসল ইতিহাস জানতে চান। ইমন প্রথমে গেলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। তারপর গেলেন জাতীয় স্মৃতিসৌধ। গেলেন শহীদ মিনারে। জানলেন ভাষার ইতিহাস। বিদেশে বাঙালিদের কাছে এসবের চর্চা আছে। কিন্তু নিজ চোখে দেখার অনুভূতি অন্যরকম। বলে বোঝানো যাবে না। ইমন ছুটে গেলেন রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে। সেখানকার ইতিহাস শুনে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। কিভাবে নরপিশাচগুলো নিরীহ মানুষগুলোকে মেরে হাত-পা বেঁধে এখানে ফেলে রেখেছিলো। ইমন গাইড থেকে আরো জানতে পান জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। হাঁটতে হাঁটতে ইমনের মনে পড়ে যায়, দ্যা ফাদার অফ দি নেশন শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। বিদেশি চ্যানেলগুলোতে এই নাম বহুবার শুনেছেন। ইমন টুঙ্গিপাড়ায় যান বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস জানতে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে। নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য মা-বোন। জন্ম নেয় অসংখ্য যুদ্ধ শিশু। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগেই স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে যান। ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে এই যুদ্ধের। ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয় বুদ্ধিজীবী দিবস। এদিন দেশের সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো পাকিস্তানিরা। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য আসা ইমনের পক্ষে সব কিছু জানা এত সহজ ছিল না। তার মাকেও খুঁজতে পারলেন না। কারণ তার পাসপোর্টের মেয়াদও প্রায় শেষ। তাই তিনি ধরেই নিলেন একজন নির্যাতিত বঙ্গমাতাই তার মা। একাত্তরে ইমন ছিলো যুদ্ধশিশু। ইমন তার মাকে না পেয়ে বুকে কষ্ট জমা রেখেই চলে যান বিদেশে। মনে মনে ভাবে তাকে আবারও ফিরতে হবে, ফিরতে হবে তার শেকড়ের কাছে। কারণ দেশটিই তার মা।