সাগরিকায় বাঁধভাঙা
আনন্দের জোয়ার
শামীম হামিদ, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৬
সাগরের একদম হাতছোঁয়া দূরে স্টেডিয়াম হওয়ায় লোকেরা জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামকে ‘সাগরিকা’ বলে ডাকেন। গতকাল অন্তত নামকরণটা শতভাগ সার্থক বলে মনে হলো। সাগরের মতো গর্জন আর ভরাপূর্ণিমার মতো জোয়ারে যেন ফুসে উঠলো স্টেডিয়াম।
বাংলাদেশ-নেপালের ম্যাচকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার উত্সবমুখর হয়ে ওঠে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। স্বাগতিক দলের খেলা দেখতে দুপুরের পর থেকেই নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় স্টেডিয়ামমুখী মানুষের ঢল নামে। নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় সৃষ্টি হয় যানজট।
সন্ধ্যার মধ্যেই গ্যালারি কানায় কানায় ভরে যায়। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বর্ণিল সাজে সজ্জিত জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে হয়ে ওঠে আরো মোহনীয়। ফ্লাড লাইটের উজ্জ্বল আলোয় অপরূপা হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। খেলার ফাঁকে ফাঁকে আতসবাজি পোড়ানোর দৃশ্য ছিল দর্শকদের জন্য বাড়তি উপহার।
তবে বিপুল সংখ্যক দর্শক সমাগমের সুযোগ নিয়ে গতকাল রীতিমত পোয়াবারো হয় টিকেট কালোবাজারীদের। স্টেডিয়ামের বাইরে কোথাও কোথাও ৫০ টাকা দামের টিকেট হাজার টাকাতেও বিক্রির খবর পাওয়া যায়।
ক্রিকেটের সূতিকাগার হিসেবে চট্টগ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা সকলেরই জানা। শহরের পাড়া-মহল্লায় ছোটখাটো ক্রিকেট টুর্নামেন্টেও দর্শকের অভাব হয় না। মানুষ নাওয়া-খাওয়া ভুলে ছোটেন মাঠের দিকে। ক্রিকেট উন্মাদনার মধ্যে দিনটা পার করে বাড়ি ফেরেন বিকালে। সেই ক্রিকেট নগরীতে এবার বসেছে টি-২০ বিশ্বকাপের আসর। টুর্নামেন্টের ৩৫টি ম্যাচের মধ্যে ১৫টি ম্যাচ মাঠে বসে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন চট্টগ্রামবাসী। এছাড়াও ইতিমধ্যে চারটি অনুশীলন ম্যাচ দেখারও সৌভাগ্য হয়েছে তাদের।
অনুশীলন ম্যাচগুলোতে দর্শক সমাগম তেমন একটা না হলেও দৃশ্যপট আমূল পাল্টে গেছে মূল পর্ব শুরুর পরপরই। চট্টগ্রামবাসী এখন রীতিমত ক্রিকেট জ্বরে আক্রান্ত। নাগরিক যন্ত্রণা ভুলে সব বয়সের মানুষের আলোচনার একটাই বিষয়। আর তা হলো ক্রিকেট। কে হবে এবারের টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়, সাকিব-তামিমদের পারফর্মেন্সের ডানায় ভর করে বাংলাদেশ কতদূর যাবে, বিশ্বকাপে শেষ হাসি কারা হাসবে, ট্রফি কার ঘরে যাবে, কে হবে ম্যান অব দি টুর্নামেন্ট। এ জাতীয় নানা আলোচনায় মুখর ছিল চট্টগ্রাম।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে চায়ের কাপে ঢেউ তোলে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। টাইগারদের খেলা দেখার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন স্থানীয় ক্রীড়ামোদীরা। গতকাল এক দর্শক নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘টিভিতেও খেলা দেখা যায়; কিন্তু স্টেডিয়ামে এসে খেলা দেখার মজাই আলাদা। আমি এখন একটা বড় ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এ আনন্দের কোনো তুলনা হয় না।’
গত রবিবার টুর্নামেন্টের প্রথম দিনে নেপাল ও হংকংয়ের প্রথম ম্যাচেই দর্শকরা তাদের সরব উপস্থিতির কথা জানান দেন। প্রায় ৫ হাজার দর্শকের উল্লাসে প্রাণবন্ত হয় সাগরিকার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের গ্যালারি। আনন্দময় শুভযাত্রা হয় পঞ্চম টি-২০ বিশ্বকাপের।
রবিবারের ওই ম্যাচে দর্শকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল নেপালি নাগরিক। চট্টগ্রামে ইউএসটিসি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছাড়াও চাকরি সূত্রে চট্টগ্রামে বসবাসকারী কয়েক হাজার নেপালী সেদিন মাঠে আসেন। নেপালের জার্সি পরে আর জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তারা আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেন।
চট্টগ্রামে স্বাগতিক দলের খেলা থাকায় গতকাল গ্যালারি হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত। সন্ধ্যায় ফ্লাড লাইট জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে দর্শকের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নেপালি ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতিতে গ্যালারি হয় বর্ণাঢ্য। সারাক্ষণই তারা নেচে-গেয়ে দলকে সমর্থন জানিয়েছেন।
স্টেডিয়াম ও আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা রক্ষা ও যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গতকাল পুলিশকে অত্যন্ত তত্পর ভূমিকায় দেখা যায়। স্টেডিয়ামের মেন গেট থেকে সাগরিকা মোড় হয়ে খেলোয়াড়দের হোটেল পর্যন্ত বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ ছিল অত্যন্ত তত্পর। তবে নিরাপত্তা রক্ষার নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কোথাও কোথাও মানুষকে হয়রানিও করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেকে গাড়ি এনে বিপাকে পড়েন। পরে টিকেট বিক্রি করে অনেকে বাড়ি ফিরে যান।