পাবনার বাঁধে হাজারো নারী-পুরুষ শিশুর মানবেতর জীবন
রুমী খোন্দকার, পাবনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৭
“একসময় কত মানুষ আমাগো বাড়ির কাম কইর্যা প্যাটের ভাত জোগাইছে। আমার ছাওয়াল-পল এহন প্যাটের ভাতে কষ্ট করে। আর কারো যেন আমাগরে মতন পোড়া কপাল না হয়। ক্ষেদের সাথে কথাগুলো বলছিলেন পাবনা সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে বাস করা বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের পেঁচাকোলা গ্রামের আব্দুল হাকিম (৬৫)।
১৫ বছর আগেও ছিলেন সচ্ছল কৃষক। যমুনার ভাঙ্গনে সবকিছু হারিয়ে এখন তিনি ঠিকানাহীন। শুধু তিনিই নন, গত ২০ বছরে নদীভাঙ্গনে সর্বস্ব খুইয়ে আশ্রয়হীনে পরিণত হয়েছে উপজেলার অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। এসব মানুষের বেশিরভাগ বাস করেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। হাজারো সমস্যা মাথায় নিয়ে তাদের দিন কাটে অর্ধাহারে।
বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বেড়া উপজেলার যমুনা, হুড়াসাগর ও বড়াল নদের পাড় বরাবর ১৯৭৯ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৮৩-তে রাজশাহী জেলা শহর প্রতিরক্ষা বাঁধের সাথে যুক্ত হয়। বেড়া উপজেলা অংশে বৃশালিখা থেকে তালিমনগর স্লুইস গেট পর্যন্ত এই বাঁধের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ১৯৮৫ সাল থেকে উপজেলায় যমুনা নদী ভাঙ্গনের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। ওই সময় থেকে নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়া শুরু করে। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যায় নদীভাঙ্গন আরো বেড়ে যাওয়ায় কয়েকদিনে গৃহহীন হয়ে পড়ে যমুুনা পাড়ের শত শত পরিবার। এসব মানুষের অন্য কোথাও মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় তারা বাঁধে আশ্রয় নেন। পরবর্তী বছরগুলোতে নদীভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিতের সংখ্যাও বেড়েছে। ১৯৯৮ সালের বন্যায় যমুনা নদীর ভাঙ্গনে গ্রামের পর গ্রাম এমনকি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার ভাঙ্গন দুর্গতরা এসে বেড়ার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে বাঁধে আশ্রিতের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। বাঁধে তুলনামূলক ভাবে বেশি বাস করে পেঁচাকোলা, নাকালিয়া, রাকশা, মোহনগঞ্জ, মালদাপাড়া, সিংহাসন, কদমতলা, বওলাকোলা, প্রভৃতি স্থানের ভিটেহারা পরিবার। মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত নদীভাঙ্গনে নিঃস্ব মানুষগুলো বাঁধের দুই পাশে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে এসব বসতি পার্শ্ববর্তী নদীর পানি ব্যবহার করছে। কলিম নামে এক দিনমজুর বললেন:প্রায় সারাবছর তারা ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পেটের পীড়াজনিত নানা রোগে ভুগে থাকেন। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় কোনভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা যে কাজ পাচ্ছেন, তাই করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এদের অনেকেই পরিবার নিয়ে আধা পেট খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
যমুনার ভাঙ্গনে উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের চরপেঁচাকোলা, পেঁচাকোলা, নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরসাফুল্লাহ, রাকশা, পূর্ব শ্রীকষ্ঠদিয়া ও পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের নগরবাড়ী, রঘুনাথপুরসহ ২৫টি গ্রাম। সাম্প্রতিক নদীভাঙ্গনে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়া চরপেঁচাকোলা গ্রামের সোনেকা পারভীন (৪৫) বললেন: “সবকিছু নদী ভাসাইয়া নিয়া গেছে। এহন আমাগরে যাওনের মোতন কোন জায়গা নাই। বাঁধেও থাহনের জায়গা নাই।”
হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আলহাজ্ব ইউনুস আলী বলেন, নদী ভাঙ্গনে তাদের ইউনিয়নের মানচিত্র পাল্টে গেছে। গত বছর (২০১৩ সাল) যমুনার ভাঙ্গনে দেড় শতাধিক পরিবার গৃহহারা হয়েছে। নদীভাঙ্গনের শিকার হয়ে এ পর্যন্ত তার ইউনিয়নের ২ হাজারের বেশি মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। কষ্টে কাটছে তাদের দিন। সরকারের উচিত তাদের দিকে নজর দেয়া।