ছেঁউড়িয়ায় লালন দোল উত্সব শেষ হচ্ছে আজ

প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় ছেঁউড়িয়াতে মহামতি লালন সাঁইয়ের সাধনপীঠে অনুষ্ঠিত হয় দোলউত্সব। আখড়াবাড়ী আঙিনায় দোল উত্সবের চতুর্থদিনে গতকাল মঙ্গলবার আগত ভক্ত-সাধুদর অনুষ্ঠিত হয় ‘সাধুসঙ্গ’ বা ‘সাধুসেবা’। এটা লালন ভক্তদের নিজস্ব উত্সব। ভক্তরা সাঁইজির নিকট দিব্যজ্ঞান লাভের আশায় এই আয়োজন করেন। ‘সাধুসঙ্গে’ শুরুতে ঝাকড়া চুলের বাউল সাধুরা একতারা, দোতারা, খঞ্জনী, মন্দিরা, তবলা হাতে মহাগুরু লালন সাঁইজির উদ্দেশ্যে ভক্তি প্রদর্শন করেন। ভক্তিশেষে শুরু হয় গুরু-শীষ্যের মধ্যে গুরুবাক্য বিনিময়। একতারা হাতে সবাই গেয়ে ওঠেন ‘ডানে বেদ, বামে কোরআন, মাঝখানে ফকিরের বয়ান, যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান, সেহি দেখতে পায়’। লালনের গানের প্রেম ও গভীরতায় মগ্ন হন ভক্তরা। গান শেষ হতে না হতেই ভক্তরা উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেন: ‘জয় গুরু’, ‘জয় গুরু’। এরপর ভক্তরা একে একে গুরুর চরণে মাথা রেখে ভক্তি প্রদর্শন করেন। ভক্তি পর্বশেষে গুরুসাধু গেয়ে ওঠেন ‘আছে ভবের তালা যেই ঘরে, সেই ঘরে সাঁই বাস করে’। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, কেমনে আসে যায়’। গানের ফাঁকে ফাঁকে এর কথাগুলোর মর্মবাণী সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেন গুরু সাধু। গভীর রাতে শুরু হয় ‘সাধুসেবা’। ভক্তদের নিজ হাতে তৈরিকৃত রাতের খাবার তালিকায় থাকে সাদা ভাত, মাছ, পঞ্চব্যাঞ্জন (পাঁচ রকমের সবিজর সমন্বয়ে তৈরি তরকারি)। সাধুসেবার সময় গুরু-শীষ্য এক ভক্তিতে আসন গ্রহণ করেন। গুরু উচ্চস্বরে বলে ওঠেন: ‘আল্লা আলেখ’। ভক্ত-শীষ্যরাও সমস্বরে বলে ওঠে: ‘আল্লা আলেখ’। শুরু হয় অধিবাস। এ পর্ব শেষে শুরু হয় মহামতি লালনের লেখা হরেক রকমের গান। প্রত্যেক সাধুই মহাগুরু ফকির লালন সাঁইয়ের প্রতি গভীর ভক্তি নিয়ে গান পরিবেশন করেন। গুরুসাধু ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দেন আর গানের ভাষায় বলে ওঠেন: ‘কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে’। সাধুসঙ্গ শেষে সকলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। খাবারের তালিকায় ছিলো দই, দুধ, পায়েশ ও পাঁচ রকমের ফল। ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীতে লালন একাডেমির আয়োজনে পাঁচদিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সবের ৩য় দিন বৃহস্পতিবার রাতে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রধান আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকার। বক্তব্য রাখেন লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী, কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী প্রমুখ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভিসি আবদুল হাকিস সরকার বলেন, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে এক অখণ্ড ঐক্যসূত্রের বন্ধন এনে দিয়েছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের এই বাউল গান। বাউল ফকিররা জাতের বিচার করেননি। সবার উপর মানুষ সত্য এই বাণী মেনেছেন অন্তর দিয়ে। তারা সর্বশ্রেণীর, সর্বজাতির মিলনসেতু। গভীর রাত পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখেন ক্লোজআপ ওয়ান কণ্ঠশিল্পী বিউটি, ওস্তাদ শফি মন্ডলসহ স্থানীয় লালন সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ। মরা কালী নদীর তীরে এ উপলক্ষে জমে উঠেছে লালন মেলা। মেলায় এসেছে নাগরদোলা, চরকা, নানারকম গৃহসামগ্রী, তৈজষপত্র, লালনের প্রতিকৃতি, একতারা, দোতারা, মালা, ক্যাসেট, গরম জিলাপী, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নানারকম খেলনা সামগ্রীসহ আজ বুধবার পাঁচদিনব্যাপী লালন দোল উত্সবের সমাপ্তি হবে।