ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ করার বিলে পুতিনের সই
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২৩:২৩
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিন্দা ও হুঁশিয়ারিকে পাত্তাই দিলেন না রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। নিজেদেরকে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত করতে রবিবার ইউক্রেনের স্বায়ত্বশাসিত উপদ্বীপ ক্রিমিয়াতে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল অনুসারে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সাথে যুক্ত করতে আনা বিলে গতকাল স্বাক্ষর করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। ক্রিমিয়ার নেতারাও এতে স্বাক্ষর করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপদ্বীপকে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করেছেন। বিলে স্বাক্ষর করার পর উচ্ছ্বসিত পুতিন বলেন, ক্রিমিয়া সব সময়েই রাশিয়ার অংশ ছিল। ক্রিমিয়ার জনগণ এই গণভোটের মাধ্যমে একটি ‘ঐতিহাসিক অন্যায়কে’ সংশোধন করেছে মাত্র।
এদিকে, ক্রিমিয়া সংকট নিয়ে মস্কো তার অবস্থানে অনড় থাকায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংস্থা জি-এইট থেকে রাশিয়াকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। জুনে রাশিয়ার সোচিতে জি-এইট শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু জি-এইট ভুক্ত বাকি সাতটি দেশ যৌথভাবে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবুয়াস বলেন, রাশিয়াকে ছাড়াই আমরা বাকি সাতটি দেশ সম্মেলন আয়োজন করব।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের শিল্পোন্নত ৮টি দেশকে নিয়ে এই জি-এইট সম্মেলন হয়। দেশগুলো হল- কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। তবে পুতিন জি-এইট থেকে সাসপেন্ড হওয়ার পর পুরোটাকেই চক্রান্ত বলে অভিযোগ করেছেন।
গতকাল বিলে স্বাক্ষর করার পর পুতিন ক্রেমলিনে রুশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ এবং উর্ধতন কর্মকর্তাদের এক বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। এতে তিনি ক্রিমিয়ার পদক্ষেপের সমর্থনে বলেন, ১৯৫৪ সালে এবং স্নায়ুযুদ্ধের শেষে দু দফায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অংশে পরিণত করাটা ছিল বড় ভুল। কারণ এই অঞ্চলটি রাশিয়ার জন্য ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনকে ভাঙতে চায় না। যারা বলছে যে ক্রিমিয়ার পর অন্যান্য অঞ্চলের পালা আসবে - তাদের কথায় কান দেবেন না। পুতিন আরো বলেন, ক্রিমিয়ায় যে গণভোট হয়েছে তা আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
উল্লেখ্য, রবিবার এক বিতর্কিত গণভোটের ক্রিমিয়ার ভোটাররা ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে যোগ দেবার পক্ষে ভোট দেন। কর্মকর্তারা বলেছেন, গণভোটে ৯৭ শতাংশ ভোট ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে পড়ে। এরপর ৪৮ ঘন্টা পার না হতেই দেশটিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া এবং পুতিন আনুষ্ঠানিকভাবে পার্লামেন্টকে জানান যে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অংশ হবার অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি এর পর এ সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ গণভোটকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করে অবরোধ আরোপ করে রাশিয়া, ক্রিমিয়া ও ইউক্রেনের সরকারি কর্মকর্তা ও অন্য ব্যক্তিবর্গের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে। ইউক্রেনের অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রী আরসেনলি ইয়ােসনিয়ুক গণভোটকে বন্দুকের মুখে করা ‘সার্কাস’ বলে অভিহিত করেছেন। গতকাল তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে কিয়েভ দেশের দক্ষিণ ও পূর্ব অঞ্চলের প্রধানত রুশভাষী অন্য অঞ্চলগুলোকে অধিকতর ক্ষমতা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্রিমিয়াতে রুশ সেনা মোতায়েনের ঘটনাকে অন্য রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান এবং ক্রিমিয়ার গণভোটকে জবরদখল বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, ইউক্রেন বলেছে, ক্রিমিয়াকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে কোনোদিন স্বীকৃতি দিবে না। জার্মানি এবং ফ্রান্সও ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত করার জন্য আয়োজিত গণভোটের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।
কিন্তু হাজার সমালোচনা সত্ত্বেও পুতিন গতকাল ক্রিমিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার বিলে স্বাক্ষর করেন। তিনি টিভি ভাষণে বলেন, রাশিয়ানদের মনে-প্রাণে ক্রিমিয়া সব দিন তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এই গণভোট সম্পূর্ণ বৈধ এবং এর ফলাফল গ্রহণযোগ্য। তিনি আরো বলেন, ক্রিমিয়ার জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাদের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি ক্রিমিয়ার জনগণকে সত্, সাহসী এবং মর্যাদাবান বলে উল্লেখ করে বলেন, তাদের দেশপ্রেম প্রশংসার দাবিদার। অন্যদিকে পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়াকে তিনি ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেন। ‘পাশে থাকার’ জন্য তিনি চীনকে ধন্যবাদও জানান।