কুমির হারাচ্ছে সুন্দরবন

সুন্দরবনের জলভাগের ‘প্রহরী’ বলে আখ্যায়িত সরীসৃপ প্রাণী কুমির হারিয়ে যাচ্ছে। বনের জলভাগে বিচরণকারী দুই প্রজাতির কুমিরের মধ্যে একটি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অপর প্রজাতিটিও বিপন্ন এবং বিলুপ্তপ্রায়। এতে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উপায়ে বনের জলে নতুন কুমির অবমুক্ত করার উপর জোর দিয়েছেন তারা। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে বনবিভাগও। ইতিমধ্যে বিপন্ন ‘এস্টুয়ারাইন’ (লোনা পানির কুমির) প্রজাতির কুমির প্রজননের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্র কাজ করছে। আরেকটি কেন্দ্র শিগগিরই কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে। সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের কুমিরের সংখ্যা নিরূপণে সর্বশেষ শুমারি হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। ঐ শুমারিতে বনে ১৫০ থেকে ২০০ কুমির রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে বন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঐ জরিপটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা হয়নি। বাস্তবে তখন একশ’রও কম কুমির ছিল। প্রসঙ্গত, বিশ্ব ঐতিহ্যের অপরূপ বনভূমি সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এরমধ্যে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। বাকি অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ অঞ্চলে সুন্দরবনে জলভাগ এক হাজার ৮৭৩ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। সুন্দরবনের চাদপাই রেঞ্জের করমজলের ফরেস্ট রেঞ্জার আবদুর রব জানান, সুন্দরবনের জলভাগের পরিমাণ অনুযায়ী অন্তত সাত হাজার কুমির বিচরণ করার কথা। কিন্তু বর্তমানে ১৭৫ থেকে ২০০টি কুমির রয়েছে। সম্প্রতি বিকল্প উপায়ে কুমির প্রজনন এবং অবমুক্ত করায় পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে। তিনি জানান, সুন্দরবনে ‘মার্শ’ ও ‘এস্টুয়ারাইন’ প্রজাতির কুমির রয়েছে। এর মধ্যে ‘মার্শ’ প্রজাতির কুমির ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সর্বশেষ ১৯৭৪ সালে বনে এ কুমির দেখা গেছে। ‘এস্টুয়ারাইন’ কুমির বিচরণ করলেও, এগুলোও বিলুপ্ত প্রায়। এদিকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার এন্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস’ (আইইউসিএন) এর রেড বুকে ‘এস্টুয়ারাইন’ প্রজাতির কুমিরকে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুন্দরবনের বিভাগীয় কর্মকর্তা (পূর্ব) মো. আমীর হোসাইন জানান, সুন্দরবনে প্রায় ৪৫০টি নদ-নদী-খাল রয়েছে। পানিতে মাছ ধরার সময় অনেক সময় কুমির জেলেদের জালে ধরা পড়ে। এরমধ্যে বেশিরভাগই বাচ্চা কুমির। জেলেরা এগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। আবার মা কুমির ডাঙায় ডিম পাড়ে। অধিকাংশ ডিমই শকুন বা অন্য পাখি খেয়ে ফেলে। আবার এক কুমিরের বাচ্চা অন্য কুমির খেয়ে ফেলে। এভাবে কুমিরের প্রজননচক্র ব্যাহত হয়ে প্রাণীটি বিলুপ্ত হচ্ছে। বিলুপ্তপ্রায় এ কুমিরকে রক্ষা করতে এবং এর সংখ্যা বাড়াতে কৃত্রিম ও সুরক্ষিত উপায়ে কুমিরের প্রজনন ব্যবস্থা চালু করেছে বন ও পরিবেশ বিভাগ। ২০০২ সালে চাদপাই রেঞ্জের করমজলে হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র যাত্রা শুরু করে। ২০০৫ সালে দুইটি মা ও একটি পুরুষ কুমির দিয়ে কুমির প্রজনন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ কেন্দ্রে ঐ বছর ২৫টি ডিম পাড়ে মা কুমির। এরপর প্রতিবছরই ২০ থেকে ৯৫টি ডিম উত্পাদিত হয়। করমজলের ফরেস্টার বাকের আহমেদ জানান, ডিমে বিশেষ মাত্রায় তাপ ব্যবহার করে কুমিরের লিঙ্গ নির্ধারণ করা যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা কুমিরগুলোর মারা যাওয়ার হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ। বাচ্চা কুমিরের আকার অন্তত ২ মিটার হলে সাধারণত তা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। এ আকার পেতে কুমিরের ৫ থেকে ৬ বছর সময় প্রয়োজন হয়। এরপর কুমিরগুলোকে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়। রেঞ্জার আবদুর রব জানান, করমজল হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রে মোট ৩৮৫টি কুমিরের প্রজনন ঘটেছে। এরমধ্যে ২ মিটার বা তার চেয়ে বড় আকারের ৭৬টি সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে পাঁচটি, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে চারটি এবং পটুয়াখালীর নতুন কুমির প্রজনন কেন্দ্রে তিনটি কুমির অবমুক্ত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (খুলনা অঞ্চল) জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির কুমির রক্ষা করতে করমজলের কেন্দ্রে সুরক্ষিত উপায়ে কুমিরের প্রজনন ঘটানো হচ্ছে। অনেকগুলো কুমির ইতিমধ্যে বনের অভ্যন্তরের জলভাগে অবমুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কুমিরের বিচরণও কিছুটা বেড়েছে। তবে সম্পূর্ণ সাফল্য পেতে আরো সময় লাগবে বলে তিনি জানান।